চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জিনগত বিশ্লেষণ করা সব নমুনাতেই বি৩ ভেরিয়েন্টের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত ৩০০ শিশুকে নিয়ে করা এক গবেষণায় ১৭টি নমুনার হোল জিনোম সিকোয়েন্সিং করে সব কটিতেই বি৩ জেনোটাইপ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, শনাক্ত ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগে শনাক্ত হওয়া বি৩ ভাইরাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। অর্থাৎ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের প্রথম টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে প্রায় অর্ধেক শিশু। আর ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু ছিল সম্পূর্ণ টিকাবিহীন।
চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের ৩০০ শিশুকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। ‘এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন’-এর আয়োজনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপের সহযোগিতায় গবেষণাটি করা হয়। এতে প্রধান গবেষক ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার।
গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদান থেকে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও জটিলতার হার উদ্বেগজনক।
টিকার বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত ৪৬ শতাংশ
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১১ বছর। এর মধ্যে ৪৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান সূচি অনুযায়ী প্রথম এমআর টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। আক্রান্ত শিশুদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রাম এলাকার এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ নিম্ন আর্থসামাজিক পরিবারের। ৩০০ শিশুর মধ্যে ১৯৭ জন, অর্থাৎ ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু ছিল সম্পূর্ণ টিকাবিহীন। এর মধ্যে ৯১ জন তখনো টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছায়নি।
অভিভাবকের অসচেতনতা বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়ায় টিকা না নেওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কারণ। হিসেবে প্রায় ৫২ শতাংশ ক্ষেত্রে এই জন্যই বাচ্চারা টিকা পায়নি। ৩০ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে অসুস্থতা, ৮ শতাংশের ক্ষেত্রে মায়ের অসুস্থতা, ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে টিকার ভয় এবং ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে টিকাদান কার্ড হারিয়ে যাওয়াকে কারণ হিসেবে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়া শিশুদের জটিলতা বেশি
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৬৩ শিশু বা ৩২ দশমিক ১ শতাংশ শিশু আগের ছয় মাসে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বা সম্পূরক পেয়েছিল। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু কোনো না কোনো মাত্রায় অপুষ্টিতে ভুগছিল।
ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়া শিশুদের ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিল হাম দেখা গেছে। তীব্র স্থূলতায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মারাত্মক জটিল হামের ঝুঁকি প্রায় ২৪ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। মায়ের টিকাদানের ইতিহাসের সঙ্গেও শিশুর জটিল হামের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যেসব শিশুর মায়েরা জানিয়েছেন, তারা নিজেরা হামের টিকা নেননি, তাদের ৫৫ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিল হাম দেখা গেছে। বিপরীতে, টিকা পেয়েছেন এমন মায়েদের সন্তানদের মধ্যে মারাত্মক জটিল হামের ঘটনা পাওয়া যায়নি।
তবে মায়েদের একটি অংশ শৈশবে ৯ মাস বয়সে টিকা নিয়েছিলেন কি না, তা মনে করতে পারেননি। ফলে এ তথ্যের ক্ষেত্রে স্মৃতিনির্ভরতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। গবেষণায় মায়ের শরীরে থাকা অ্যান্টিবডির বিষয়টিও দেখা হয়। শুধু গুণগত পরীক্ষায় অ্যান্টিবডি শনাক্ত হলেই শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। কারণ অ্যান্টিবডি পজিটিভ থাকা মায়েদের সন্তানও হামে আক্রান্ত হয়েছে। তাই মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডির প্রকৃত মাত্রা জানতে পরিমাণগত পরীক্ষা প্রয়োজন বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: হামের লক্ষণ নিয়ে চমেক হাসপাতালে ১২ শিশু ভর্তি
ছয় মাস থেকেই টিকা দেওয়ার সুপারিশ
গবেষকেরা বলছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে হামের টিকার সুরক্ষার মাত্রাও বাড়ে। এক ডোজ টিকা প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং দুই ডোজে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া যায়। বয়সভেদে এই সুরক্ষার মাত্রাতেও পার্থক্য রয়েছে। ছয় মাস বয়সে টিকা দিলে সুরক্ষা প্রায় ৫০ শতাংশ, নয় মাসে ৮৫ শতাংশ এবং ১২ মাসে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। পরবর্তী ডোজগুলো নেওয়ার মাধ্যমে সুরক্ষা ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচিতে প্রথম ডোজ ৯ মাস এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। তবে চট্টগ্রামসহ সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতি বিবেচনায় গবেষক দল ছয় মাস বয়স থেকেই এমআর টিকাদান শুরু করার সুপারিশ করেছে। গবেষকদের মতে, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, কলম্বিয়া, কম্বোডিয়া, ইরান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ঝুঁকি ও প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতি বিবেচনায় ছয় থেকে আট মাস বয়সের মধ্যে টিকাদান শুরু করা হয়। তবে ছয় মাসের আগে দেওয়া টিকা পরবর্তী নিয়মিত ডোজের বিকল্প নয়; প্রাদুর্ভাবের সময় অতিরিক্ত ডোজ দেওয়া হলে পরবর্তীতে নির্ধারিত বয়সে রুটিন টিকার ডোজ নেওয়া প্রয়োজন।
১৭ নমুনায় একই জেনোটাইপ
হামের ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণে ১৭টি নমুনার হোল জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ থেকে পাঁচটি করে এবং মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে দুটি নমুনা নেওয়া হয়। ১৭টি নমুনাতেই বি৩ জেনোটাইপ শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, একই জেনোটাইপের উপস্থিতি সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। বাংলাদেশে ২০২৬ সালের বিভিন্ন নমুনার জিনোম ডেটাতেও বি৩ জেনোটাইপ শনাক্ত হওয়ার তথ্য উন্মুক্ত ডেটাবেইসে রয়েছে।
হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ৯৫ শতাংশের ওপরে নেওয়। গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় ক্যাচ-আপ টিকাদান জোরদার এবং প্রাদুর্ভাবের সময় ছয় মাস বয়স থেকে এমআর টিকা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের এমআর বা এমএমআর টিকাদান এবং শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
হাসপাতালে হামের সন্দেহভাজন রোগীদের জন্য পৃথক জ্বর শনাক্তকরণ, ট্রায়াজ ও আইসোলেশনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন ও চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন।


