যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘কঠোরভাবে আঘাত’ করার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বৃহস্পতিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ পরিচালনার কথা জানিয়েছে। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, সংঘাত নিরসনে চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরান ‘অতিরিক্ত সময় নিচ্ছে’।
এর জবাবে ইরান জানিয়েছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। এর আগের দিনও একই ধরনের হামলা চালানোর দাবি করেছিল তেহরান।
সর্বশেষ এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি আরও চাপে পড়েছে।
মার্কিন হামলার পর হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি শহরে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার স্থাপনা এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছিল।
নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলরত দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। তবে এ দাবির কোনো নিশ্চিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
একই সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, হরমুজ প্রণালি সব ধরনের নৌযানের জন্য সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে সেন্টকম জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখনও প্রণালিটি ব্যবহার করে চলাচল করছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের খবর এবং ট্যাংকারে হামলার দাবির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এশিয়ার বাজারে প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, ‘আমরা গতকাল তাদের কঠোরভাবে আঘাত করেছি এবং আজও কঠোরভাবে আঘাত করব।’ তিনি আরও বলেন, ইরানের নেতারা সমঝোতায় পৌঁছাতে অযথা বিলম্ব করছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ইরানকে সমঝোতার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যেকোনো চাপ বা হুমকির বিরুদ্ধে ইরান দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, যা প্রথমে দুই সপ্তাহের জন্য কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এরপর থেকে উভয় পক্ষ মাঝেমধ্যে হামলা চালালেও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়ায়নি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়েছে এবং একইসঙ্গে সামরিক উত্তেজনাও বেড়েছে। মঙ্গলবার একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করে। পরে এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করে আইআরজিসি।
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ক্রমেই গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত সীমিত সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। এই সীমিত সংঘর্ষ যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।”
তিনি সব পক্ষকে কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান।


