কে এই ‘সিরিয়াল কিলার’? যে কারণে করেছে ৬ খুন

কে এই ‘সিরিয়াল কিলার’? যে কারণে করেছে ৬ খুন
নিজেকে `সম্রাট' নামে পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তি কখনো পুলিশের, কখনো র‍্যাবের আবার সেনাবাহিনীর পোশাক পরতো। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

সাভারে সাত মাসে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ সম্রাট নামে যাকে গ্রেপ্তার করেছে তার প্রকৃত নাম-পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খুনের কারণ বর্ণনাতেও আছে অসংলগ্নতা। সাভার মডেল থানার আশপাশে প্রায় সময় ঘুরে বেড়ানো সম্রাট নিজেকে ‘কিং সম্রাট’ এবং ‘মশিউর রহমান খান সম্রাট’ বলে দাবি করছে পুলিশের কাছে। সর্বশেষ গত রোববার জোড়া হত্যাকাণ্ডে তার নাম বলছে পুলিশ।

সাভার থানা পুলিশ জানিয়েছে, ভবঘুরে প্রকৃতির সম্রাট গত কয়েক বছর ধরে মূলত সাভার মডেল থানার সামনে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের আশপাশ, পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও পাকিজার মোড়ে ঘোরাফেরা এবং রাত্রি যাপন করত।

গত রোববার সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে পুড়িয়ে ফেলা জোড়া মরদেহ পাওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা সম্রাট যে নাম-পরিচয় দিয়েছে, তার সত্যতা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ওই এলাকায় ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট। সম্রাট নিজের পুরো নাম ওই কাউন্সিলরের পুরো নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলছে। এদিকে, পর্যায়ক্রমে ছয়জনকে খুনের যে কারণ সে দাবি করছে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে পুলিশের।

বেরিয়ে এল প্রকৃত পরিচয়

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নিজেকে সম্রাট বলে পরিচয় দেওয়া এই সিরিয়াল কিলারের প্রকৃত নাম হচ্ছে সবুজ শেখ। তার বাবার নাম পান্না শেখ। তারা তিন ভাই ও চার বোন। বড় বোন শারমিন। দ্বিতীয় সবুজ শেখ। তারপর আরেক বোন ও আরেক ভাই। তারপরে আরও দুই বোন। তাদের নানা বাড়ি বরিশালে।

সবুজের জন্মস্থান এবং বাবার বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয়। গ্রামের সবাই তাদেরকে ভয়ংকর হিসেবে চেনে।

মঙ্গলবার ভোরে সাভার মডেল থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সোমবার বিকালে ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত সুপার মো. আসাদুজ্জামান টাইমসকে বলেছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অজ্ঞাতনামা পাঁচজনসহ ছয়খুনের দায় স্বীকার করার পর সম্রাটকে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘খুনের কারণ হিসেবে সম্রাট একেকবার একেক রকম দাবি করেছে। একবার দাবি করছে ওরা অনৈতিক কাজ করায় তাদেরকে সে মেরে ফেলেছে।’

‘আবার দাবি করছে, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন স্থান থেকে ভবঘুরে নারীদের সে নির্জন স্থানে নিয়ে আসত।’

‘যাদের নিয়ে আসত, তারা অন্য কারও সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদের হত্যা করত।’

‘সর্বশেষ ঘটনার তিন থেকে চার দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে কমিউনিটি সেন্টারে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতালায় নিয়ে মেরে ফেলে সম্রাট। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে। তারপরে লাশ পুড়িয়ে ফেলে’ বলেন তিনি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, সম্রাটের বক্তব্য কতটা সত্য তা যাচাই করা হচ্ছে।

ঢাকা জেলার ডিবির (উত্তর) পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম বলেছেন, ‘সম্রাট তার বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে পৌর এলাকার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংক কলোনি এবং তার বাবার নাম মৃত সালাম এবং মৃত রেজেয়া। এসব কিছু যাচাই-বাছাই না করেই তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী জানান, সম্রাট একজন সাইকোপ্যাথ।

আরও পড়ুন

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের নেত্র বিজনেস সেন্টারের মালিক সুবল রায় বলেছেন, ‘তিন থেকে চার বছর ধরে এই ভবঘুরে সেখানে আসা-যাওয়া করে নিয়মিত। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা চেয়ে তার দিন চলে।’

থানার সামনে চৌরাস্তা মোড়ের ডাব বিক্রেতা জুয়েল জানান, অনেক পুলিশের কাছ থেকে এই সম্রাট নিয়মিত টাকা চেয়ে নিত। অনেক গণমাধ্যমকর্মীও তাকে চা-সিগারেট খাওয়ায়। থানার মূল ফটকের বাহিরে পোস্ট অফিসের পাশে মনিরের হোটেলে প্রায়ই খাওয়া-দাওয়া করেন তিনি।

জুয়েল আরও জানান, অনেক সময় তার হাতে স্মার্টফোন দেখা যেত। তবে একটি বাটন ফোন সার্বক্ষণিক থাকত। অপরিষ্কার থাকতেন তিনি এবং সার্বক্ষণিক উচ্চবাচ্য করে গালিগালাজ করতেন।

সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে জমির দলিলের কাজে সম্পৃক্ত রুবেল পাঠান জানান, মাঝেমধ্যে তাকে তিনি চা-সিগারেট খাওয়াতেন। তবে তিনি যে একজন ভয়ংকর সিরিয়াল কিলার তা কখনো ধারণাও করতে পারেননি।

সেনাবাহিনীর পোশাক গায়ে ‘সম্রাট’। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

থানার সামনের বাড়ি মালিক আব্দুর রহিম জানান, ৬ খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা এই ভবঘুরে চিৎকার চেঁচামেচি করত প্রায় সময়। বিভিন্ন সময় পুলিশের পুরোনো পোশাকও পড়তেন সম্রাট। এখন তিনি পুলিশকে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।

ব্যাংক কলোনি এ এবং বি ব্লকের একাধিক স্থায়ী বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সম্রাট যে ঠিকানা এবং পুরো নাম বলছে তা সঠিক নয়, ভুয়া।

তিনি ব্যাংক কলোনীর কোন বাসিন্দা নয় বলে নিশ্চিত করেছেন কমিউনিটি এবং বিট পুলিশের একাধিক সদস্য।

নিজেকে সম্রাট নামে পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তি কখনো পুলিশের, কখনো র‍্যাবের আবার কখনো সেনাবাহিনীর পোশাক পড়ত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এদিকে, কারামুক্ত একাধিক হাজতি জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে এই সম্রাট কাশিমপুর-২ কারাগারে ৬০ নম্বর সেলের পূর্ব বিল্ডিং এর নিচতলায় বন্দী ছিল। কারাগারের ভেতর সে ছিল বেপরোয়া। প্রায়ই চুরি করত। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে ছিল বিপদে।

সাত মাসে ৬ খুন

গত বছরের ৪ জুলাই দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে সাভার মডেল মসজিদ-সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানের পেছনে ৭৫ বছর বয়সী আসমা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরে ময়নাতদন্তে জানা যায়, তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার নাতি মো. মিঠু মিয়া অপমৃত্যু মামলা করেন, যা পরবর্তীতে হত্যা মামলায় রূপ নেয়।

সে বছরের ২৯ আগস্ট বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে সাভার পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পার্বতীনগর এলাকার একটি পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে সাদা পাঞ্জাবি ও কালো ট্রাউজার পরিহিত আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠায়। সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, মৃতের গলায় ওড়না প্যাঁচানো ছিল। মরদেহের দুই হাত গামছা দিয়ে বাঁধা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ পচে যাওয়ায় আঘাতের চিহ্ন নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

এরপর ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে একই এলাকার পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার বাথরুমের দক্ষিণ পাশ থেকে আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথা ও গলায় জখমের চিহ্ন ছিল। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে।

একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর সকাল ৮টা ২০ মিনিটে একই কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার বাথরুম থেকে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের আগুনে পোড়া ও গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দেহের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। আগুনে পোড়ানোয় মুখমণ্ডল ও আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এসব ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলে কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে সিসিটিভি এবং লাইট লাগানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে একই কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার বাথরুম থেকে আগুনে পোড়া অবস্থায় দুইটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একজন আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং অপরজন আনুমানিক ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী। আগুনে পোড়ানোয় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ভবঘুরে সম্রাটকে শনাক্ত করে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজে একটি মরদেহ সরাতে দেখা যায় সম্রাটকে। তারপর পুলিশ তাকে আটক করে।

পুলিশ জানিয়েছে, একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সম্রাটকে শনাক্ত করা হয়। ভবঘুরের ছদ্মবেশে সে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ঘোরাফেরা করছিল।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী বলেন, ‘গত চার থেকে সাত মাসে সংঘটিত ছয়টি খুনই সম্রাট করেছে বলে তিনি আমাদের কাছে স্বীকার করেছে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড একই এলাকায় এবং একই ধরনের কৌশলে সংঘটিত।’

সোমবার সম্রাটকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ।

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ৬ হত্যা মামলার আসামি সম্রাট। জবানবন্দি শেষে তাকে জেলহাজতে পাঠিয়েছে আদালত।

সোমবার সন্ধ্যায় আদালত পুলিশের পরিদর্শক কামাল হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে অবশেষে বড় সাফল্যের দাবি করেছে পুলিশ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad