নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার কথা ২২ জানুয়ারি, তার আগেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অভিযোগে দেশের নির্বাচনী পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংযম না থাকলে এবং ইসি কঠোর অবস্থান না নিলে প্রচার শুরু হওয়ার পর মাঠে সহিংসতা বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হচ্ছে এক ধরনের অচলাবস্থা। বিএনপির ছাত্রসংগঠন, ছাত্রদল ইসির সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে, পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এতে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে প্রায় সব বড় দলই ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিএনপির অভিযোগ, মাঠ প্রশাসন ও ইসির কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা জামায়াতের পক্ষে কাজ করছেন। অন্যদিকে, জামায়াত ও এনসিপির দাবি, প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে আছে।
সোমবার রাতেও বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা সতর্ক করে বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও পাবনা–৪ আসনের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তার নির্বাচনী এলাকায় আগে বড় ধরনের সহিংসতা হয়েছে। স্থানীয় ইসি কর্মকর্তারা এবার কঠোর না হলে একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তার দল শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার চালাতে চায়। তবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী যেন স্বাভাবিক প্রচারে বাধা সৃষ্টি না করে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। ইসি সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
সরকার ও ইসি বারবার বলছে, তারা কোনো চাপের কাছে মাথানত করবে না এবং নির্বাচন হবে সুষ্ঠু। তবে এসব আশ্বাসের পরও নির্বাচনের আগের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ থামছে না।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও বর্তমানে বিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন সংস্কার কমিটির সদস্য আব্দুল আলিম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনের আগে দলগুলোর ইসির কাছে যাওয়া নতুন নয়। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
আপিল শুনানির সময় অবস্থান কর্মসূচি এবং দলীয় নেতাদের সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার কাছে অভিযোগ জানানোকে তিনি অস্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, ইসি দৃঢ় অবস্থান না নিলে এবং রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ না করলে প্রচার শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
গত কয়েক দিন ধরেই উত্তেজনার লক্ষণ স্পষ্ট। রোববার সকালে ছাত্রদল ইসির সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। সোমবারও একই কর্মসূচি পালন করা হয়।
জামায়াত ও এনসিপির অভিযোগ, আপিলের শেষ দিনে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা বিএনপি প্রার্থীদের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে ইসির ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই অবস্থান কর্মসূচি।
সোমবার সন্ধ্যায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বৈঠক শেষে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, বিএনপির চাপে ইসি ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের মনোনয়ন বৈধ করেছে। ইসি নিরপেক্ষ অবস্থানে না ফিরলে এনসিপি ও তাদের ১০ দলীয় জোট রাজপথে নামবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন, তিনি কি ‘ম্যানেজড নির্বাচন’ করে ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছেন। তার অভিযোগ, অযোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ করতে বিএনপি তাদের ছাত্রসংগঠনকে ব্যবহার করছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সাজিব ভূঁইয়া বলেন, ৩১ জন ঋণখেলাপি ও সমসংখ্যক দ্বৈত নাগরিকের মনোনয়ন বৈধ করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বিএনপির প্রার্থী। এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে রাজপথের আন্দোলনেও যাবে দলটি।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একাধিক নেতা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনে রদবদল হওয়ার কথা থাকলেও ‘বিশেষ কারণে’ ইসি তা করেনি। তাদের দাবি, পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তপ্ত করার চেষ্টা চলছে, তবে বিএনপি কোনো ফাঁদে পা দেবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ বলেন, নির্বাচনের আগে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ নতুন নয়। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে সব দলই ইসিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ইসি দৃঢ়ভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলে এখনও অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
রোববার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মাঠ প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে দলের আপত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
বিএনপি যেখানে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামীও সরকার ও ইসির ওপর চাপ বজায় রাখছে। দলটির অভিযোগ, একটি বড় দলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। রোববার বিকালে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব অভিযোগ তুলে ধরে।


