রাজকীয় দায়িত্ব ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হওয়ার ছয় বছর পর ব্রিটেনে নিজেদের ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান। ইংল্যান্ডে ফিরে আসার পর এই প্রথম তারা একসঙ্গে একাধিক জনসমাগমে অংশ নিতে যাচ্ছেন।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার মধ্য ইংল্যান্ডের নটিংহাম শহরে তিনটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করবেন এই দম্পতি। ২০১৭ সালে বাগদানের ঘোষণা দেওয়ার পর এই শহরেই প্রথম একসঙ্গে জনসমক্ষে এসেছিলেন তারা।
হ্যারি ও মেগানের এবারের কর্মসূচিতে রাজকীয় আয়োজনের কিছু বৈশিষ্ট্যও রাখা হয়েছে। অনুষ্ঠানের ঘোষণায় তাদের জন্য ‘ডিউক অ্যান্ড ডাচেস অব সাসেক্স’ উপাধি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের সফরের বিভিন্ন কার্যক্রম সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরতে আগে থেকেই সাংবাদিকদের একটি নির্দিষ্ট দলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সময় তাদের দাতব্য কর্মকাণ্ডের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিচিত আর্চওয়েল এবার খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির নামও কর্মসূচির প্রচারে তেমনভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে প্রিন্স হ্যারির বাবা ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হ্যারি ও মেগান রাজপরিবারের সদস্য থাকলেও তারা আর রাজকীয় দায়িত্ব পালনকারী সদস্য নন। রাজকীয় দায়িত্ব ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যাওয়ার সময় তারা নিজেরাই এই নির্দেশনা মেনে নিয়েছিলেন।
গত সেপ্টেম্বরে হ্যারি ও মেগান যুক্তরাজ্যে ফিরে আসেন। এর পেছনে সন্তানদের বর্ধিত পরিবারের সান্নিধ্যে রাখাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এই দম্পতি।
তারা ফিরে আসার কিছুদিন পর রাজার পক্ষ থেকে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে বাকিংহাম প্রাসাদ জানায়, হ্যারি ও মেগান তাদের রাজকীয় সম্বোধনসূচক উপাধি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবেন। অর্থাৎ তারা আর ‘হিজ রয়্যাল হাইনেস’ বা ‘হার রয়্যাল হাইনেস’ সম্বোধন ব্যবহার করবেন না। পাশাপাশি তারা যেসব দাতব্য কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন, সেগুলো যুক্তরাজ্যের সাধারণ নাগরিক হিসেবেই পরিচালনা করবেন।
তবে রাজপ্রাসাদের কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, হ্যারি ও মেগানের ‘তারকাখ্যাতি’ তাদের রাজপরিবারের সমান্তরালে একধরনের বিকল্প রাজকীয় কেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ করে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ ও জনসমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রিন্স ও প্রিন্সেস অব ওয়েলস উইলিয়াম ও কেট এবং রাজকীয় দায়িত্ব পালনকারী অন্য সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন।
হ্যারি-মেগানের প্রচার কমিটি সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার নটিংহামে হ্যারি ও মেগানের সফরসূচিতে রয়েছে কমিউনিটি রেকর্ডিং স্টুডিও, হিম্মাহ এবং এপিক পার্টনার্স নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান।
কমিউনিটি রেকর্ডিং স্টুডিও সংগীত, মঞ্চ পরিবেশনা ও খেলাধুলার কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।
হিম্মাহ মধ্য ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় খাদ্যসহায়তা কেন্দ্র। অন্যদিকে এপিক পার্টনার্স সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের জন্য খেলাধুলা, শিক্ষা ও পরামর্শমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে হ্যারি ও মেগানের সম্পর্ক বেশ পুরনো। প্রিন্স হ্যারি এক দশকের বেশি সময় ধরে কমিউনিটি রেকর্ডিং স্টুডিও ও এপিক পার্টনার্সের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে মেগান ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘টুগেদার: আওয়ার কমিউনিটি কুকবুক’ নামের রান্নার বই তৈরিতে হিম্মাহর সঙ্গে কাজ করেছিলেন।
ব্রিটেন ছেড়ে যাওয়ার পরও এই দম্পতি দেশটির বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিয়ে আসছিলেন। তবে সে সময় তাদের মূল মনোযোগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের এবং সন্তানদের জন্য নিরাপদ জীবন গড়ে তোলা। তখন তারা জানিয়েছিলেন, রাজপরিবারের অর্থায়নে কিংবা সহায়তায় নয় বরং তারা নিজেদের উপার্জনে জীবনযাপন করতে চান।
পরবর্তী সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় তারা নেটফ্লিক্স ও স্পটিফাইয়ের সঙ্গে বিপুল অর্থের চুক্তি করেন।
বাকিংহাম প্যালেস সূত্রে জানা যায়, রাজকীয় দায়িত্ব ছাড়ার পর রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এই দম্পতির সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে থাকে।
হ্যারি ও মেগান অভিযোগ করেন, মেগানের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে রাজপ্রাসাদের কর্মীরা যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিলেন না। তারা রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও বর্ণবাদ ও সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করার অভিযোগ তোলেন।
অবশ্য সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সম্পর্কের এই টানাপোড়েন কিছুটা কমতে শুরু করেছে। হ্যারি তার বাবা রাজা চার্লসের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, তার সন্তানরা যেন তাদের দাদাকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পায়, তিনি সেটিই চান। রাজা চার্লস বর্তমানে ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। ২০২৪ সালে তার শরীরে এই রোগ শনাক্ত হয়। তবে তিনি কোন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত, এখনো তা প্রকাশ হয়নি।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, হ্যারি ও মেগান তাদের দুই সন্তানকে নিয়ে বর্তমানে ইংল্যান্ডের কটসওল্ডস এলাকায় বসবাস করছেন। অক্সফোর্ডের পশ্চিমে অবস্থিত কটসওল্ডস পাহাড়ি ঢেউখেলানো ভূমি, গ্রাম ও কৃষিখামারে ঘেরা একটি গ্রামীণ এলাকা। সেখানে রাজপরিবারের মালিকানাধীন নয়, এমন একটি ব্যক্তিগত বাসভবনে থাকছেন তারা। তাদের সাত বছর বয়সী ছেলে প্রিন্স আর্চি এবং পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে প্রিন্সেস লিলিবেটও তাদের সঙ্গে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ফিরে আসতে পেরে হ্যারি ও মেগান সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও তাদের প্রত্যাবর্তন ঘিরে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। বিশেষ করে হ্যারি এখনো সরকারি অর্থায়নে পুলিশি নিরাপত্তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এক্ষেত্রে সন্তানদের নিরাপত্তাকে তিনি প্রাধান্য দিতে চাইছেন বলে জানা গেছে।
রাজকীয় দায়িত্ব ছাড়ার পর তার ও মেগানের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে যে পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল, তা বাতিল করা হয়। প্রিন্স হ্যারির দাবি, রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার কারণেই তিনি ও তার পরিবার এখনো নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছেন। এই নিরাপত্তা উদ্বেগ তাদের সন্তানদের জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। এমনকি যুক্তরাজ্যে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যার কারণে আর্চি ও লিলিবেটকে বিদ্যালয় পরিবর্তন করতে হয়েছে।


