অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক মার্কিন সাংবাদিক ও ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনায় ১০ সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি পুলিশ। গত সপ্তাহে এসব হামলার ঘটনা ঘটে।
পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থান থেকে ওই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, সামরিক বাহিনীর জারি করা নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের নির্দেশ অমান্য এবং অবৈধ নির্মাণকাজের অভিযোগ রয়েছে। সম্ভাব্য আলামত ও যানবাহনও জব্দ করা হয়েছে।
শুক্রবার ফিলিস্তিনের আবু ফালাহ গ্রামে জলপাই সংগ্রহের খবর সংগ্রহ করার সময় মুখোশধারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ওয়াশিংটন পোস্টের ফটোসাংবাদিক হেইডি লেভিনকে মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
এর পর দিন কাছের তাইবেহ এলাকায় বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পোল্যান্ড ও ক্যাথলিক চার্চের কূটনীতিকদের ওপর হামলা চালান মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারীরা।
গ্রেপ্তারের ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘হেইডি লেভিনকে গুরুতরভাবে আক্রমণ ও মারধরকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি।’
জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে এই সহিংসতা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ফিলিস্তিনিদের জীবিকা নির্বাহের জন্য জলপাই সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিস্তিনে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা ইসরায়েলি সংগঠন ইয়েশ দিন রোববার জানিয়েছে, আগের ২০ দিনে জলপাই সংগ্রহের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ২৬৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে তারা।
এর মধ্যে জলপাই সংগ্রহকারীদের ওপর সহিংসতা ও শারীরিক হামলার ৯৮টি ঘটনা রয়েছে। এ ছাড়া ফসল চুরি এবং জলপাইগাছ কেটে ফেলা ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
শুক্রবার খিরবেত আবু ফালাহর কাছে জলপাই সংগ্রহের সময় বসতি স্থাপনকারীদের কয়েকটি হামলার একটির ঘটনা প্রত্যক্ষ করে বিবিসির একটি দল। স্থানীয় এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় হেইডি লেভিনসহ ১২ জন ফিলিস্তিনি আহত হন। আহতদের মধ্যে ফিলিস্তিনি ও মার্কিন উভয় নাগরিকত্বধারী চারজনও ছিলেন।
অভিজ্ঞ এই ফটোসাংবাদিক তার সামরিক সুরক্ষাবর্মের সামনে ও পেছনে স্পষ্টভাবে ‘প্রেস’ লেখা থাকলেও হামলা থেকে রেহাই পাননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একদল বসতি স্থাপনকারী তাকে মাটিতে ফেলে বারবার লাথি মারেন। এ সময় তার ক্যামেরা ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।
হামলায় তার মেরুদণ্ডের চারটি কশেরুকা ভেঙে যায়, একটি পাঁজর ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে কেটে যাওয়ার ক্ষত হয়। একটি আঙুলে গভীর ক্ষত হওয়ায় অস্ত্রোপচারও করতে হয়েছে তাকে।
সোমবার মধ্য ইসরায়েলের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লেভিন বলেন, ‘পরিস্থিতি আরও অনেক খারাপ হতে পারত।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সাংবাদিকেরা সব সময় সুরক্ষাবর্ম ও হেলমেট পরতে চাই না। এগুলো ভারী, অন্যরা না পরলে এগুলো পরে কাজ করা বিরক্তিকর মনে হতে পারে, নিজেকে কিছুটা বোকাও লাগে। কিন্তু সেদিন আমরা সবাই এগুলো পরেছিলাম। এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’
লেভিন আরও বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, এগুলো না পরলে আমার আরও গুরুতর আঘাত লাগত, বিশেষ করে মাথায়। যতটা সম্ভব আমি মুখ মাটির দিকে রাখার চেষ্টা করেছি, এতে মুখ রক্ষা পেয়েছে। আমি অনুমান করছি না, আমি জানি, আমি সত্যিই অনেক ভাগ্যবান।’
হেইডি লেভিনের ওপর হামলাকে ‘মুখোশধারী কাপুরুষদের চালানো ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন হাকাবি। হামলাকারীদের বছরের পর বছর কারাগারে রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘পশ্চিম তীরে উত্তেজনা বা কোনো ধরনের সংকট দেখতে চান না’।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ জানিয়েছেন, তিনি লেভিনকে বলেছেন, ‘এই হামলার অপরাধীদের ঘৃণ্য আচরণ ইসরায়েলের নাগরিকদের কিংবা রাষ্ট্রটির মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে না।’
শনিবার বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পোল্যান্ড ও ক্যাথলিক চার্চের প্রতিনিধিদের একটি দল জলপাই সংগ্রহের কার্যক্রম দেখতে তাইবেহ সফর করে। আবু ফালাহর প্রায় ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এলাকাটিতে ওই সফরের সময় হামলার ঘটনা ঘটে।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো জানান, হামলায় তাদের কনস্যুলেটের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ফ্রান্সের মেয়র বার্নার বুদুকে মারধর করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারীরা গাড়িবহরটির মুখোমুখি হচ্ছেন। ফ্রান্সের জাতীয় পতাকার রঙের ফিতা পরা এক ব্যক্তিকে একটি গাড়ির পাশে ঝুঁকে থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে পাথরও ছোড়া হয়েছিল।
প্রেভো হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের দায়িত্ব ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা দেওয়া, কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা।
আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দার মধ্যেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় আবু ফালাহ ও তাইবেহের ঘটনার ভিডিও প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কার্যালয়টি ঘটনাগুলোকে ‘কথিত’ হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে দাবি করেছে, এগুলো ইসরায়েল ও পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপনকারীদের বদনাম করার একটি ‘সমন্বিত প্রচারণার’ অংশ।
বিবিসিকে লেভিন বলেন, ‘ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি খুবই আন্তরিক ছিলেন। হামলাকারীদের দুর্বৃত্ত বলে অভিহিত করেন এবং তাদের গ্রেপ্তারে নিজের ক্ষমতার মধ্যে সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন পড়ছিলাম। সেটি দেখে আমি হতবাক। মনে হয়েছে, এটি আমার মুখে বড় একটি থাপ্পড় মারার আঘাত।’
লেভিনের মতে, বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বন্ধ করার বিষয়ে নেতানিয়াহুর স্পষ্ট বার্তা দেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, তার বক্তব্যের বার্তাটি ছিল এর উল্টো। যেন বলা হচ্ছে, ‘এভাবেই চালিয়ে যাও’।’
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে সেখানে প্রায় ১৬০টি ইসরায়েলি বসতি গড়ে উঠেছে। এসব বসতিতে প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসবাস করেন। গাজাসহ এসব ভূখণ্ডকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে চায় ফিলিস্তিনিরা। ওই এলাকাগুলোতে বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি আনুমানিক ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এসব বসতি অবৈধ।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ৯৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৫ জন বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।
একই সময়ে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের হাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
ইসরায়েলের পুলিশ কমিশনার ড্যানিয়েল লেভি বলেছেন, পশ্চিম তীরে সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য, ‘পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা যা-ই হোক না কেন’।
তবে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনা বিরল।
ইয়েশ দিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের আদর্শগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধের ঘটনায় ইসরায়েলি পুলিশের ৯৩ শতাংশের বেশি তদন্ত শেষ হয়েছে কোনো অভিযোগপত্র দাখিল ছাড়াই।


