সৌদি আরবে বাংলাদেশি যে তরুণ-তরুণীর মৃত্যৃদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের মধ্যে নজরুল ইসলামের পরিবার জানত তিনি তিন বছর ধরে কারাগারে বন্দী। স্বজনদের সঙ্গে তার প্রতি সপ্তাহে কথা হতো। তবে কী কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই বিষয়টি যেমন স্বজনদেরকে নজরুল জানাননি, তেমনি স্বজনরাও এ বিষয়ে সরকারের কোনো সংস্থার কাছে যোগাযোগ করেনি।
নজরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। কৃষক পরিবারের চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।
পরিবারের অভাব দূর করতে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান তিনি। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। দায়িত্ব পালন করেন মক্কান গরীর হারাম শরিফে।
সৌদি আরবে যাওয়ার সাত মাস পর থেকে নজরুলের আর কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না তার স্বজনরা।
তার মা রেহেনা বেগম জানান, হঠাৎ একদিন তার ছেলে জেলখানা থেকে ফোন দিয়ে জানান তিনি বন্দী। তবে কী কারণে তিনি বন্দী সে বিষয়টি আর জানাননি। এরপর প্রতি রোববার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন তার ছেলে। কিন্তু গত সপ্তাহে আর ফোন আসেনি। পরে সংবাদমাধ্যমে মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরীফুল হাসান এজন্য দায়ী করেছেন সরকারের কর্মকৌশলের অভাবকে। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ জানে না, বিদেশে একজন বন্দী হলে কোন প্রক্রিয়ায় কাকে জানাবে, সেই কৌশল আমরা করিনি।’
তিনি বলেন, ‘কত হাজার মানুষ বিভিন্ন জেলখানায় আছে, পরিবারগুলো জানে না। অনেক ক্ষেত্রে মারা যাওয়ার পরে জানতে পারে।’
এই ঘটনায় অনেক প্রশ্ন আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নজরুলকে কেবল এক মিনিট কথা বলতে দিত। এই সময়ে কী আর বলা যায়?’
‘আসলে এই জায়গায় আমেরিকা, ইউরোপীয় বা নিদেনপক্ষে ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কান হতো, তাহলে ফাঁসি হতো না। তারা জানে বাংলাদেশের প্রতিবাদ করার সক্ষমতা নেই। আসলে আমরাই আমাদের নাগরিকদের সম্মান দেই না,’ বলেন শরীফুল।
নজরুলের সঙ্গে যার প্রাণদণ্ড হয়েছে, সেই সিতি আখতারকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন নজরুলের স্বজনরা। দুই জনের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল সে বিষয়েও কোনো ধারণা না থাকার কথা জানিয়েছেন তারা।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের একজন প্রবাসী কর্মী ছিলেন এবং অন্যজন ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। সেই হিসেবে সিতি ওমরাহ করতেই সে দেশে গিয়েছিলেন।
গত ১৪ অক্টোবর নজরুল ও সিতির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা সে দেশের সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে এই দণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে কিছুই জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। দণ্ড কার্যকরের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজ করার অপরাধে এই প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত অভিযোগ প্রকাশ করা হয়নি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুলকে আইনি সহায়তার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিনা সে বিষয়েও জানেন না তার বাবা-মা।
তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আসার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার ফুফু আবেদা বেগমও। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসি মো. সাঈদ বলেন, মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।


