ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজের একটি আবাসিক এলাকায় হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় দুই কিশোরী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ছয়জন। শহরটি ঘিরে রেখে সরবরাহপথ বন্ধ করে দেওয়ায় বেসামরিক নাগরিকেরা ‘গুরুতর ঝুঁকিতে’ রয়েছেন বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার তুর্ক বলেন, হুথিরা তাইজের অধিকাংশ সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করে শহরটিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এতে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
এপির খবরে বলা হয়, এর এক দিন আগে হুথিদের হামলায় ইয়েমেন সরকারের একটি সামরিক প্রশিক্ষণশিবিরে ৭৩ জন নিয়োগপ্রত্যাশী নিহত হন। দেশটির সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। ওই হামলায় দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।
সোমবার আল-আলাম সামরিক শিবিরে প্রশিক্ষণের জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নিয়োগপ্রত্যাশীদের ওপর হামলাটি চালানো হয়। শাবওয়া প্রদেশের গভর্নর আওয়াদ ইবন আল-ওয়াজির জানান, নিহত ও আহত নিয়োগপ্রত্যাশীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। প্রদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল, সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য নয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইয়েমেন সংঘাতের নতুন একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেওয়ায় সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুথিরা সাম্প্রতিক সময়ে হামলা বাড়িয়েছে।
গত জুলাইয়ে হুথি নিয়ন্ত্রিত সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার পর সংঘাত আরও তীব্র হয়। এতে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে।
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশের কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত তাইজ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শহরটি দেশটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোরও অন্যতম।
গত মাসে লোহিত সাগরের নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলের পর তাইজের দিকে আবারও অগ্রসর হতে শুরু করে হুথি যোদ্ধারা। কয়েক মাস ধরে চলা অভিযানে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবর্ষণের মাধ্যমে ইয়েমেন সরকারের বাহিনীকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করেছে।
মঙ্গলবারের হামলায় তাইজের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হামলার সময় বাড়িতে না থাকলেও ফিরে এসে নিজের ঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দা জয়নব আলী।
তিনি বলেন, ‘আমরা এতিম একটি পরিবার। এখন কী করব, তা বুঝতে পারছি না।’
মঙ্গলবার রাতে ইয়েমেন সরকারের বাহিনী দাবি করে, তাইজের বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের হামলার চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে এবং এতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির কয়েক ডজন যোদ্ধা নিহত হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। স্বাধীনভাবেও দাবিটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হুথিরা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার তুর্ক অবিলম্বে তাইজে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘মানবিক সহায়তা অবিলম্বে শহরে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে এবং সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করতে হবে। যেসব বেসামরিক নাগরিক শহর ছেড়ে যেতে চান, তাদের স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’
তুর্ক হুথি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীকে এমন এলাকায় বিস্ফোরক অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান, যেখানে এসব অস্ত্র বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে।


