অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পার্লামেন্টের নারী স্বতন্ত্র সদস্য হেলেন হেইনসকে (৬৫) গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনায় ৪৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ বলছে, হামলাটি ছিল ‘পরিকল্পিত’। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, হেলেন হেইনস দেশটির ফেডারেল পার্লামেন্টে ইন্ডাই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। সোমবার স্থানীয় সময় বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে গ্রামীণ শহর ওয়াংগারাট্টায় টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ির ধাক্কায় আহত হন তিনি। এ ঘটনা চালকের উদ্দেশ্য এবং দেশটির রাজনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি করেছে।
পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম বা হামলার উদ্দেশ্য নিশ্চিত করেনি। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম তার নাম ব্রেন্ডন নিউজান্ট বলে জানিয়েছে।
বুধবার আদালতে তার হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালিয়ে গুরুতর আহত করা, ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর আঘাত করা এবং কমনওয়েলথের একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার অভিযুক্তের বাবা রড নিউজান্ট একটি বিবৃতি দেন। এতে তিনি হেইনসকে বন্ধু এবং ‘আমাদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও সবার প্রিয় সদস্য’ বলে বর্ণনা করেন।
এপির বরাতে তিনি বলেন, ‘হেলেন ২০ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের বন্ধু। তার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা কল্পনার বাইরে।’
মঙ্গলবার কয়েকটি সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, গাড়িটি প্রথমে শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে এগিয়ে যায়। পরে ঘুরে এসে হেইনসকে ধাক্কা দেয়। সাত বছর ধরে নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। হামলার সময় নিজের গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে মালপত্র বের করছিলেন হেইনস।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দুটি গাড়ির মাঝখানে চাপা পড়েছিলেন তিনি। এবিসি ও সিএনএনের সহযোগী সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তার একটি পা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে সেটি কেটে ফেলতে হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা তার অন্য পা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
ভিক্টোরিয়া পুলিশের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট অ্যাশলি মেসন জানান, ঘটনার পরপরই প্রত্যক্ষদর্শীরা হেইনসকে সাহায্য করতে ছুটে যান। পুলিশ পৌঁছানো পর্যন্ত তারা চালককে আটকে রাখেন।
এবিসিকে নরসুন্দর রিকি জেফেরিজ বলেন, তিনি নিজের দোকান থেকে ছুটে বেরিয়ে আসেন। চালকের পকেট থেকে একটি ছুরি নিয়ে তাকে গাড়ি থেকে টেনে বের করেন। এরপর তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। ঘটনার পর থেকে তাকে নায়ক হিসেবে প্রশংসা করা হচ্ছে।
জেফেরিজ বলেন, ‘তাকে গাড়ি থেকে বের করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। কারণ, সেটিই ছিল সঠিক ও নিরাপদ কাজ।’
অন্য পথচারীদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা বিপদের কথা একবারও ভাবেনি, সরাসরি সাহায্য করতে ছুটে গেছে।’
অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বিরল। তবে গত এক বছরে রাজনীতিকদের হয়রানি ও হুমকি দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে বলে সরকারের উদ্ধৃত অস্ট্রেলীয় ফেডারেল পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। সংস্থাটির কমিশনার ক্রিসি ব্যারেট এক বিবৃতিতে বলেছেন, হামলাটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে।
মঙ্গলবার গভীর রাতেও হেইনসের অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও স্থিতিশীল ছিল বলে জানিয়েছে ভিক্টোরিয়া পুলিশ।
‘সততা ও নীতিনিষ্ঠায় ভরপুর’
পুলিশ তখনও অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ দ্রুত দেশবাসীকে জানান, ঘটনাটি ছিল ‘ইচ্ছাকৃত’।
হেইনসকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই বলে জানান আলবানিজ। তবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক আলোচনার ‘উত্তাপ’ বেড়েছে। এ উত্তাপ কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
সোমবার এবিসিকে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো জায়গা নেই।’
হেইনসকে আকাশপথে মেলবোর্নে নেওয়া হয়। ওই রাতেই আলফ্রেড হাসপাতালে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তার পরিবার দ্রুত সাহায্যের জন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের ধন্যবাদ জানিয়েছে।
ভিক্টোরিয়া পুলিশের নেতৃত্বে হামলার তদন্ত চলছে। এতে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী দলের সদস্যরা যুক্ত রয়েছেন। ওই দলের সঙ্গে অস্ট্রেলীয় ফেডারেল পুলিশ এবং অস্ট্রেলীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে।
২০১৯ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফেডারেল পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন হেইনস। গ্রামীণ এলাকায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবার দাবিতে তিনি নির্বাচনে লড়েছিলেন। পার্লামেন্টে তিনি রাজনীতিতে সততা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি জুয়া খাতে সংস্কার, উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ধাত্রী হিসেবে কাজ করতেন। তার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তিনি অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা গ্রামীণ ধাত্রীসেবা কার্যক্রমগুলোর একটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে আলবানিজ বলেন, ‘হেলেন হেইনস অত্যন্ত পরিশ্রমী। তিনি অসাধারণ বুদ্ধিমতী। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ, সততা ও নীতিনিষ্ঠায় ভরপুর। পার্লামেন্টের সর্বত্র এবং তার সংস্পর্শে আসা সবার কাছেই তিনি শ্রদ্ধার পাত্র।’
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা হেইনসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে তিনি প্রশংসিত ও সম্মানিত ছিলেন। সহকর্মীদের কেউ তাকে ‘ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তি’, আবার কেউ ‘আলোর দিশারি’ বলে বর্ণনা করেছেন। লিবারেল পার্টির নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর সোমবারকে দেশের জন্য ‘খারাপ দিন’ বলে অভিহিত করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘ওয়াংগারাট্টায় নিজের নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে হেলেনের ওপর হামলায় অস্ট্রেলীয়রা ক্ষুব্ধ ও হতবাক হবেন। আমাদের দেশ এমন জায়গায় পরিণত হতে পারে না, যেখানে সহিংস হামলা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।’
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জনপ্রিয়তা বেড়েছে ডানপন্থী ওয়ান নেশন পার্টির। দলটির নেতা পলিন হ্যানসনও বলেছেন, নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধির ওপর সহিংসতার কোনো জায়গা নেই।
এক্সে তিনি লেখেন, ‘সংসদ সদস্য ও তাদের কর্মীদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় না পেয়ে জনগণের সেবা করার সুযোগ থাকতে হবে।’


