পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে সই করা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টে জমা দিয়েছে তুরস্ক। এর মধ্য দিয়ে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তিধর দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের খবরে বলা হয়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে থাকা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হলো।
গত আগস্টে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, সদস্য তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর বহির্বিশ্বের সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ন্যাটোর সনদের পঞ্চম অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এ বিধানে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ রয়েছে। ওই অনুচ্ছেদে সশস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রগুলোর একক বা সম্মিলিতভাবে আত্মরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন দেশই একে অপরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের প্রতি হুমকি দূর করতে ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা’ নিতে রাজি হয়েছে।
অনির্দিষ্টকাল মেয়াদের এই চুক্তির অনুমোদনসংক্রান্ত নথি রিয়াদে অবস্থিত সচিবালয়ে জমা দেওয়ার পর এটি কার্যকর হবে। তবে কার্যকর হওয়ার প্রথম ১০ বছর কোনো সদস্যদেশ চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে পারবে না।
পাকিস্তান এরইমধ্যে ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তাদের ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ কার্যকর থাকার কথা জানিয়েছে। তবে তুরস্কের ক্ষেত্রে চুক্তিটি কার্যকর করতে সংসদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন ও অনুমোদনের ক্ষমতা মূলত নির্বাহী বিভাগের হাতে ন্যস্ত। দেশটির কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়নের আওতাভুক্ত বিষয়গুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনই যথেষ্ট।
পাকিস্তানের সংবিধানের ৯০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ফেডারেশনের নির্বাহী ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নামে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োগ করবে। প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নিয়ে এ সরকার গঠিত হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রধানমন্ত্রীই ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্যদিকে তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকলেও দেশের বাইরে সেনা মোতায়েনের জন্য সংসদের আলাদা অনুমোদন নিতে হবে।
রয়টার্স জানিয়েছে, তুরস্কের পার্লামেন্টের স্পিকার নুমান কুরতুলমুশ বর্তমানে কিরগিজস্তান সফরে রয়েছেন। দেশে ফেরার পর তিনি চুক্তিটি সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিশনে পাঠাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী শুক্রবারের মধ্যেই কমিশনে চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক বুরহানেত্তিন দুরান বলেছেন, দেশটির সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তিন দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দুরান বলেন, ‘আমাদের দেশগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা এই কৌশলগত অংশীদারত্বের লক্ষ্য সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করা, প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমাদের অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।’
তবে চুক্তির আওতায় তুরস্কের ভূমিকা সীমিত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি রয়টার্সকে বলেন, তুরস্কের সহযোগিতা মূলত সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও অস্ত্রব্যবস্থা সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এ জোটের অধীনে এখন পর্যন্ত অন্য কোনো ধরনের সামরিক মোতায়েন হয়নি।
ইয়েমেনের হুতিদের হামলা প্রতিরোধে তুরস্ক কীভাবে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘মক্কা চুক্তি কোনো “আক্রমণাত্মক চুক্তি” নয়। অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে তুরস্ক সেখানে সেনা পাঠাবে না।’
এদিকে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য না হলেও সৌদি আরবকে সম্ভাব্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন নিয়ে আগামী ২৬ অক্টোবর মিসরের সংসদেও ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।
সংসদীয় অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়ার আগে চুক্তিটির সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু প্রথমবারের মতো প্রকাশ করে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিআরটি।
এদিকে সৌদি আরবে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার নিন্দা জানিয়ে রিয়াদের সামরিক প্রযুক্তির চাহিদা পূরণে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে আঙ্কারা।
লোহিত সাগরে নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোটে যোগ দিতেও সম্মত হয়েছে এরদোয়ানের সরকার।
মক্কা চুক্তিতে প্রতিরক্ষা শিল্প, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রসদ সহায়তা এবং সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনার পর্যায়েও সহযোগিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।
সৌদি আরবের সঙ্গে মক্কাচুক্তির পাশপাশি তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া বুধবার প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার একটি সমঝোতা স্মারক সই করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
কাতারে এ সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে।
সোমবার দোহায় অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা ফোরামে কাতারের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি জানান, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের একটি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও সমঝোতা স্মারক সইয়ের আয়োজনে ঘোষণা করা হতে পারে।
অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দোহায় যাবেন তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির।


