দুই বছরের ধসের পর ২০২৫ সালে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের মোটরসাইকেলের বাজার। কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, আগের বছরের চেয়ে বিক্রি ১৯ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৭২ লাখ হলেও তা ২০২২ সালের রেকর্ড সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ১৯ লাখ ইউনিটের চেয়ে এখনো ২৪ শতাংশ কম।
ডলার সংকটে আমদানির সীমাবদ্ধতা, মোটরসাইকেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং ক্রেতাদের ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতি চাপ সব মিলিয়ে ২০২৩ সালে ৩৪ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে আরও ৩ শতাংশ কমে দেশের বাজারে বিক্রি ৩ দশমিক ৯৫ লাখ ইউনিটে নেমে আসে।
বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের চিফ মার্কেটিং অফিসার শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বড় ধাক্কার পর সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ায় ২০২৫ সালে কাঁচামাল এবং যন্ত্রাংশের আমদানি নির্বিঘ্ন হয়।’
একই সঙ্গে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি কমার ধারায় থাকায় মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়েছে বলে জানান।
খরচ অনেক বাড়লেও বেশিরভাগ কোম্পানি দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে ক্রেতারাও ডলারজনিত মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।
বড় মোটরসাইকেলের দিকে ঝোঁক
তবে, এই পুনরুদ্ধারটি অসমত্ম ছিল এবং এটি গ্রাহকদের পছন্দে স্পষ্ট কাঠামোগত পরিবর্তনকে নির্দেশ করেছে, যেখানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলগুলোর প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
বাংলাদেশের মোটরসাকেলের বাজার ধীরে ধীরে উচ্চ সক্ষমতার মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকছে।
২০২৫ সালে ১৫০-১৬৫ সিসি সেগমেন্টটি মোট বাজারের প্রায় ৪৭ শতাংশ দখল করেছে। আগের বছরের চেয়ে ৭ শতাংশের মতো বেড়ে এ সেগমেন্টের বিক্রি দাঁড়ায় ২ দশমিক ২৩ লাখ ইউনিটে।
১২৫ সিসি সেগমেন্টটির বিক্রি ২০২৫ সালে ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক শূন্য ৮ লাখ ইউনিটে পৌঁছেছে।
ক্রেতারা কম দামের এন্ট্রি লেভেলের বাইকের বদলে আরও শক্তিশালী মোটরসাইকেল চাইছেন।
এ কারণে ৮০ থেকে ১১০ সিসি মোটরসাইকেলের বিক্রি নেমে এসেছে ৯৭ হাজার ৯৯৭ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২১ সালে ছিল ২ দশমিক শূন্য ৬ লাখ ইউনিট।
স্কুটার বিক্রি ১৩ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালে ১২ হাজার ৩৬৭ ইউনিটে পৌঁছেছে, তবে তা এখনো মোট বাজারের ৩ শতাংশেরও কম।
২০২৩ সালে ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের অনুমোদন হওয়ার পর ১৬৬ থেকে ৩৭৫ সিসি সেগমেন্টের মোটরসাইকেলের বিক্রি বাড়ছে এবং ২০২৫ সালে এ সেগমেন্টের ৩০ হাজারের বেশি বাইক বিক্রি হয়েছে।
রয়্যাল এনফিল্ড উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেগমেন্টে ৪৪ শতাংশ বাজার শেয়ার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, ২০২৫ সালে তারা স্থানীয় কারখানায় উৎপাদিত ১৩ হাজার ৪০৮ ইউনিট বিক্রি করেছে।
এরপর হোন্ডা ৮ হাজার ৮৬১ ইউনিট, সুজুকি ৩ হাজার ৪১০ ইউনিট, সিএফ মোটো ২ হাজার ৩১৮ ইউনিট, ইয়ামাহা ১ হাজার ৮২২ ইউনিট, বাজাজ ৪৮৫ ইউনিট, রানার ২৭ ইউনিট এবং হিরো ৭ ইউনিট বড় মোটরসাইকেল বিক্রি করেছে।
জাপানি ব্র্যান্ডের জয়যাত্রা
২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারে জাপানি নির্মাতাদের আধিপত্য আরও দৃঢ় হয়েছে। সুজুকি, ইয়ামাহা এবং হোন্ডা এখন বাংলাদেশের বাজারের ৫৮ শতাংশ দখল করেছে, যা ২০২০ সালে ছিল মাত্র ২১ শতাংশ।
তীব্র প্রতিযোগিতায় সুজুকি এবং ইয়ামাহা ২০২৫ সালে ৯৪ হাজার ইউনিটের বেশি বিক্রি করে মোট বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ করে দখল করেছে। পুরো বছরে সুজুকি কিছুটা এগিয়ে থাকলেও শেষ ছয় মাসে ইয়ামাহা প্রায় ২২ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে কিছুটা এগিয়ে ছিল।
হোন্ডা ২০২৫ সালে প্রায় ৮৩ হাজার ইউনিট বিক্রি করে ১৮ শতাংশ শেয়ার পেয়ে চতুর্থ অবস্থানে ছিল।
ভারতীয় ব্র্যান্ড হিরো ৮০ থেকে ১০০ সিসি সেগমেন্টে ৪৮ শতাংশ শেয়ার নিয়ে ৮৪ হাজার ৪৭০ ইউনিট বিক্রি করেছে এবং তৃতীয় স্থানটি ছিল তাদের দখলে।
বাজাজ, যা একসময় বাজারের প্রধান খেলোয়াড় ছিল, ২০২৫ সালে ৮০ হাজার ৭৮৩ ইউনিট বিক্রি করেছে এবং তাদের বাজার শেয়ার ২০২০ সালের ৩৮ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
টিভিএসের বিক্রি ২০২৫ সালে অস্বাভাবিক কমে ১১ হাজার ১৮৮ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে, যা মোট বাজারের বাজারের মাত্র ২ শতাংশ। ২০২২ সালে তাদের বাজার শেয়ার ছিল ১৯ শতাংশের মত।
বিক্রির উপাত্তে দেখা যায় ২০২২ সালের আগস্ট মাসে দেশে জ্বালানির দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি বাড়তে শুরু করে এবং এ প্রবণতা এখনো অব্যহত রয়েছে।
বাংলাদেশে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের উৎপাদক ও পরিবেশক এসিআই মোটরসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আরও স্পোর্টি, নির্ভরযোগ্য ও জ্বালানী সাশ্রয়ী জাপানি বাইকগুলোর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।’
ই্উক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সার্বিকভাবে দাম বাড়লেও জাপানি ব্যান্ডগুলোর সঙ্গে ভারতীয় এবং অন্যান্য ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের দামের পার্থক্য অনেক কমেছে। ক্রেতারা বাজেট কিছুটা বাড়িয়ে জাপানি মোটরসাইকেল কেনাকে লাভজনক মনে করছেন।
বড় ধসের পর ২০২৫ সালে ঘুরে দাঁড়ালেও মোটরসাইকেল উৎপাদকরা বলছেন, স্থানীয় বাজার আরও কয়েকগুণ বড় হওয়ার সুযোগ রয়েছে।


