ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মাগুরা অংশে পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের জন্য নির্মিত একটি বিশেষ বিশ্রামাগার দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় এই প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
মহাসড়ককে নিরাপদ ও টেকসই করার লক্ষ্যে চালকদের জন্য নির্ধারিত পার্কিং এবং বিশ্রামের সুবিধা দিতে উদ্যোগ নেয় সরকার। চালকদের ক্লান্তিজনিত কারণে ঘটা সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের অধীনে মাগুরা, কুমিল্লা, সিরাজগঞ্জ ও হবিগঞ্জে মোট ২২৬ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে এই ধরনের চারটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। মাগুরার লক্ষ্মীকান্দর এলাকায় ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় চারতলা ভবনের এই বিশ্রামাগার কমপ্লেক্স।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, একটানা গাড়ি চালানোর ফলে চালকরা ঝিমুনি ও ক্লান্তিতে ভোগেন যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। চালকরা যাতে পর্যাপ্ত বিরতি নিতে পারেন সেভাবেই এই বিশ্রামাগারটি নকশা করা হয়েছিল। এই কমপ্লেক্সে চালকদের ঘুমানোর ব্যবস্থা, পণ্যবাহী গাড়ির পার্কিং, বিনোদন কেন্দ্র, ক্যান্টিন ও গোসলের সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া এখানে ইবাদতখানা, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা, গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ, আধুনিক স্যানিটেশন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে মাগুরার এই কেন্দ্রটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করার পর এক বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো চালু করা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চালকরা দীর্ঘ সময় বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালান বলে এই কেন্দ্রটি নিয়ে অনেক আশা ছিল। তারা অভিযোগ করেন, বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অব্যবহৃত পড়ে থাকায় অবকাঠামোটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
চা বিক্রেতা আম্বিয়া খাতুন, ট্রাকচালক মোমিনুল ইসলাম এবং ইজিবাইক চালক রহিম উদ্দীন জানান, প্রায় সাড়ে ছয় একর জায়গার ওপর নির্মিত এই কেন্দ্রটি চালু হলে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতো।
দূরপাল্লার ট্রাকচালক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, মহাসড়কে নির্দিষ্ট কোনো পার্কিং ব্যবস্থা নেই। ফলে চালকরা বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে বিশ্রাম নেন। তিনি আরও জানান, এই কেন্দ্রটি চালু হলে তারা শান্তিতে ঘুমাতে পারতেন। এতে তাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতো যা নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের জন্য জরুরি।
আরেক চালক মমতাজ উদ্দীন বলেন, চালকদের সুবিধার কথা ভেবেই এটি করা হলেও এখন পর্যন্ত এটি বন্ধ থাকায় তারা সেই আগের মতোই রাস্তার ধারেই পড়ে থাকেন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ইলিয়াস ফারুক জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কার্যক্রম শুরু করার জন্য গত ৫ এপ্রিল একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তবে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়নি। এ কারণে আগামী ২৭ এপ্রিল পুনরায় নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, উপযুক্ত দরদাতা নির্বাচন শেষ হলেই কেন্দ্রটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১৭ জনের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৫৯ জন মারা গেছেন, যার মধ্যে বাস ও ট্রাক দুর্ঘটনার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মহাসড়কে দুর্ঘটনা অন্তত ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে অনেক দুর্ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চালকদের বিশ্রামহীন দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোকে দায়ী করা হয়।


