মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সের্গেই গর চলতি মাসের শেষ দিকে তার প্রথম সরকারি সফরে ঢাকায় আসছেন। এই সফরে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রধান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পর্ক সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতেও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী গর এ সময় বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফরের প্রস্তুতি চলছে এবং জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ২৮ জুলাই ঢাকায় ফিরবেন এবং তার সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করেই বিশেষ দূতের সফরসূচি নির্ধারণ করা হচ্ছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাস পর চীন, তুরস্ক, সৌদি আরব, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের প্রেক্ষাপটে এই সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ দূতদের সাধারণত নির্দিষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণের জন্য পাঠানো হয়, নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্য নয়। তাই গরের মূল লক্ষ্য হবে বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অগ্রাধিকার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া।
সের্গেই গর একজন প্রভাবশালী মার্কিন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক সংগঠক। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
সফরের সময়ের তাৎপর্য
এই সফরের সময় নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এর এক মাস আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করেন। সেই সফরে ঢাকা ও বেইজিং মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, তিস্তা প্রকল্প, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং চট্টগ্রামে একটি চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকা সফর করেছেন। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন এবং সৌদি আরব ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও তিনি উচ্চপর্যায়ের সফরের আমন্ত্রণ পেয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে কূটনীতিকদের ধারণা, ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সরকার কীভাবে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করতে চায়, তা জানতে ওয়াশিংটন আগ্রহী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘বিশেষ দূতদের সাধারণত নির্দিষ্ট মিশনে পাঠানো হয়। নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অগ্রাধিকার সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করবেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলো আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে না, কারণ ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো পরিচালনা করে থাকে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচনায় বাংলাদেশের সঙ্গে প্রধান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পর্ক গুরুত্ব পাবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও চীন নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক নতুন সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করেছে। একই সঙ্গে তুরস্কের সঙ্গেও বাংলাদেশের যোগাযোগ জোরদার হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি রাশিয়া সফর করেন। সেখানে তিনি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় ওয়াশিংটন বিশেষভাবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা ও ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা নিতে চাইবে।
গর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবেও দায়িত্বে থাকায় আলোচনায় ভারত ও পাকিস্তান সম্পর্কেও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসতে পারে। এই দুটি দেশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, মিয়ানমারের পরিস্থিতি এবং এর ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে ইরান ও রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
আরেক বিশ্লেষক বলেন, ‘নতুন সরকার পরিবর্তিত আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছে এবং বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বার্থ কোথায় নির্ধারণ করছে—ওয়াশিংটন তা জানতে আগ্রহী থাকবে।’
অভিজ্ঞ বিশেষ দূত
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সের্গেই গর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে সরাসরি হোয়াইট হাউসকে রিপোর্ট করেন। মার্কিন রাজনীতিতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট এবং একাধিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করেছেন।
এর আগে, তিনি সিনেটে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে যোগাযোগ ও আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত বিষয় তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কূটনীতিকদের মতে, এমন এক সময়ে গরের ঢাকা সফর ওয়াশিংটনের বাংলাদেশের প্রতি অব্যাহত আগ্রহের প্রতিফলন, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে।
বাংলাদেশ যখন স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে একাধিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে, তখন গরের এই সফর উভয় দেশের জন্য আঞ্চলিক পরিস্থিতি, কৌশলগত অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নিয়ে মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে।


