সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে লক্ষ্য করে নতুন কোনো তদন্ত শুরু করবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ব্যাংকভিত্তিক চলমান তদন্তে তার (সাহাবুদ্দিন) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে বা কোনো ব্যক্তি বিশেষকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে না। তবে কোনো ব্যাংকভিত্তিক তদন্তে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘সাহাবুদ্দিন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে ছিলেন। সে কারণে তাকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো অনুসন্ধান চালানো হবে না। কিন্তু আর্থিক খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংকে যে তদন্ত চলছে, সেখানে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।’
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ভাইস-চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৭ সালের জুনে চট্টগ্রামের জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে তিনি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন। এর কয়েক মাস আগে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
জেএমসি বিল্ডার্সকে এস আলম গ্রুপের বেনামি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের নথিতে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিনে পরিচালক হয়। তবে কোম্পানিটির প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ফরেনসিক নিরীক্ষায় ইসলামী ব্যাংকসহ এস আলম-নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি ব্যাংকে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২৪টি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্য পায়, যেগুলোর বিরুদ্ধে ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ব্যাংকটির ৮১ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
পরে বিএফআইইউর প্রতিবেদন উচ্চ আদালতে দাখিল হলে আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তদের বিদেশ ভ্রমণেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এ মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
মো. সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হওয়ায় তার নামও আলোচিত হচ্ছে ওই তদন্ত-সংশ্লিষ্ট আলোচনায়।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বিশেষকে টার্গেট করে তদন্ত করে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে অনিয়ম শনাক্ত করা হয়। তদন্তে কোনো ব্যক্তির ভূমিকা পাওয়া গেলে, সেই অনিয়মে পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে লক্ষ্য করে তদন্ত চালানোর সুযোগ নেই। প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব অডিট হয়, বাহ্যিক নিরীক্ষা হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও পরিদর্শন করে। তদন্ত সবসময় ঘটনার ভিত্তিতে হয়, ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়।’
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর ২০২৩ সালে মো. সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই সময়ে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের ছেলে আহসানুল আলম ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে। তবে দুই দফা পুনর্গঠনের পরও ইসলামী ব্যাংকে এখনো পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন হয়নি; বর্তমানে এক সদস্যবিশিষ্ট কমিটির মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।


