গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ও পরে বিভিন্ন উপায়ে দলটির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী বাংলাদেশ ছেড়ে যান। সেই তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সব সদস্যও রয়েছেন। বর্তমানে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন তারা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বেশির ভাগের পাশাপাশি দলটির সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের নেতাদের বড় একটি অংশ বর্তমানে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। অর্থসম্পদ থাকায় তারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন।
অন্যদিকে, দেশে থেকে যাওয়া দলের নেতা-কর্মীরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। আত্মগোপনে থাকা বা বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে গিয়ে তাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হচ্ছেন। দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করতেও বিদেশে থাকা নেতাদের তেমন দ্বিধা দেখা যাচ্ছে না।
দেশ ছাড়তে না পারা কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন সাবেক মন্ত্রী ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, মো. আব্দুর রাজ্জাক, আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, জুনাইদ আহমেদ পলক, আবদুস সোবহান গোলাপ, আহমদ হোসেন, আখতারুজ্জামানসহ আরও অনেকে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি ঘোষণা দেন, আগামী ডিসেম্বরে দিল্লি থেকে বাংলাদেশে ফিরবেন। একই সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
তার এই আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের ভেতরে থাকা অনেক সমর্থক নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। বিদেশে থাকা অনেক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকলেও দেশের ভেতরে তাদের কার্যকর ভূমিকা খুবই কম। বরং তাদের অনলাইন আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশে থাকা দলের অনেক নেতা-কর্মী নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন।
শেখ হাসিনা ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে কয়েকজন নেতা শেখ হাসিনা ও দলের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের সামনে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু পরে সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেন। এরপর ওই কর্মীরা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলে অনেক নেতাকেই তাদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় না।
বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত ভোলার সাবেক এক সংসদ সদস্য ঢাকায় বড় জমায়েত করার দাবি করার পর শেখ হাসিনার তিরস্কারের মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে। সুযোগ পেলেই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের দায়িত্বে থাকা দলীয় নেতারা ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। তবে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বলছেন, এসব প্রতিশ্রুতিতে তাদের আস্থা নেই।
আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সমর্থক এখনো দেশে রয়েছেন। তাদের অনেকে আত্মগোপনে আছেন। আবার অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা আদালত ও কারাগারে বারবার ছোটাছুটি করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
তাদের অনেকেই আর্থিক সংকটে রয়েছেন। কিন্তু তাদের অভিযোগ, এই দুঃসময়ে কেউ তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না। বিপরীতে বিদেশে অবস্থানকারীদের গ্রেপ্তার বা হামলার কোনো ঝুঁকি নেই। তারা নির্ভয়ে জীবনযাপন করছেন।
দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সক্রিয় থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনলাইন প্রচারের পাশাপাশি তারা ঝটিকা মিছিলও করছেন। এসব মিছিল থেকেও তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।
নাগরিক সমাজের মধ্যেও আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক রয়েছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারাও নানা ধরনের চাপ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
শেখ হাসিনার সর্বশেষ ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের পর দলের অনেক নেতা-কর্মী নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছেন। আগামী ডিসেম্বরে তিনি এবং বিদেশে থাকা নেতারা বাংলাদেশে ফিরবেন—এমন ঘোষণার পর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা অনেকেই আবার প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। জামিনে মুক্তি পাওয়া কয়েকজন নেতাও আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়েছেন। অন্যদিকে, সরকার কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সারা দেশে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক।
কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের পর থেকে হামলা, গণপিটুনি ও কথিত বিচারবহির্ভূত ঘটনায় আওয়ামী লীগের ৩০০ জনের বেশি নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে দলটির অন্তত ৪০ জন নেতা-কর্মী হেফাজতে মারা গেছেন।
নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও শেরপুরে আত্মগোপনে থাকা দলটির কয়েকজন নেতা বলেন, প্রভাবশালী ও বিত্তশালী নেতা-কর্মীরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যারা দেশে রয়ে গেছেন, তাদের বড় অংশ আবেগ ও আনুগত্য থেকে দলটিকে সমর্থন করেন।
তাদের অভিযোগ, গত দুই বছরে কোনো জ্যেষ্ঠ নেতা তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে অর্থবহ যোগাযোগ রাখেননি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন কলে উৎসাহের কথা বলে তাদের ‘দলের জন্য যতটা সম্ভব কিছু করার’ আহ্বান জানানো হয়েছে।
তাদের আরও অভিযোগ, পলাতক অনেক দলীয় নেতা থাইল্যান্ড, কলকাতা ও নেপালে ব্যবসায় লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বিশেষ করে হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে তাদের বিনিয়োগ রয়েছে।
এ ছাড়া অনেক নেতা-কর্মীর বাংলাদেশে এখনো ব্যবসা রয়েছে। কারও কারও বাড়ি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি ভাড়া দিয়েও আয় হচ্ছে। নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হুন্ডির (অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা) মাধ্যমে তাদের কাছে নিয়মিত অর্থ পাঠানো হচ্ছে।
দেশ ছেড়ে যাওয়া নেতারা
দুই বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। বিদেশে থাকা অন্য উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, আব্দুর রহমান, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, শেখ হেলাল উদ্দিন, হাছান মাহমুদ, আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, নিজাম উদ্দিন হাজারী, শেখ সোহেল, শেখ জুয়েল, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ তন্ময়, শামীম ওসমান, বেনজীর আহমেদ, বাহাউদ্দিন বাহার, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, সাইফুল ইসলাম, পঙ্কজ দেবনাথ, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র তাহসীন বাহার সূচনা, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমসহ আরও অনেকে।
তাদের একটি বড় অংশ কলকাতা ও দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করছেন। অন্যরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড, নেপাল, দুবাই ও পর্তুগালে বসবাস করছেন।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কয়েকশ নেতাকর্মীও কলকাতা, শিলং, আসাম, দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
যুবলীগ ও ছাত্রলীগের প্রায় ২০০ নেতাকর্মীও নেপালে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।


