হুথিদের হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সহিংসতার মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। বার্তাসংস্থা এএফপি’র খবরে বলা হয়, শুক্রবার তিন দেশের মধ্যে হওয়া এই প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চাইছে রিয়াদ। এই যুদ্ধে আশপাশের কয়েকটি দেশও জড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর দিয়ে নৌযান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে।
এই যুদ্ধ ইরান ও ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথিদের আরও সক্রিয় করে তুলেছে। উভয় পক্ষই সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন ক্রমেই কম নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি সরকারি সংবাদ সংস্থা ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, তিন দেশ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সইয়ের সই করেছে। চুক্তিতে তিন দেশ ‘সমষ্টিগত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা এবং অঞ্চল ও এর বাইরেও শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায়’ একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই চুক্তির আওতায় কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, চুক্তিটির উদ্দেশ্য ‘সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করা’। আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সৌদি আরব তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দেশগুলো সংঘাতের মধ্যস্থতা এবং এর সমাধানের জন্য উদ্যোগ চালিয়ে আসছে।
তবে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের যোগাযোগ পরিচালক পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, চুক্তিটি ‘কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়’।
তুরস্ক সরকারের অপতথ্যবিরোধী সংস্থাও এক্সে দেওয়া পৃথক এক পোস্টে বলেছে, ‘ন্যাটোর মূল অঙ্গীকারসহ তুরস্কের বিদ্যমান আন্তর্জাতিক জোটগুলোর প্রতি দায়িত্বের সঙ্গে এই চুক্তি সাংঘর্ষিক নয়।’
রিয়াদও স্পষ্ট করে বলেছে, ‘এই চুক্তি কোনো সামরিক জোট বা সাম্প্রদায়িক বলয় গঠনের উদ্যোগ নয়।’
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি এক্সে বলেন, ‘এটি কোনো পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা অস্ত্র প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত নয়; বরং টেকসই সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই চুক্তি এই অঞ্চলের কোনো দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়।’
এদিকে, এ চুক্তি সইয়ের আগে সৌদি সামরিক বাহিনী ও সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এএফপিকে জানায়, চুক্তিটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও ‘অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করেছে।’
লন্ডনের কিংস কলেজের আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ‘এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে মিত্রতার পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্পষ্ট আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।’
চুক্তি সই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও উপসাগরীয় দেশটিতে সফর করেন।
এর আগে, ২০২৫ সালেই সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিল। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হওয়ায় ওই পদক্ষেপটি বিশেষভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতার উদ্যোগেও পাকিস্তান কাজ করেছে। অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চলা আলোচনায় তুরস্ক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে।
অন্যদিকে, রিয়াদ ও প্রতিবেশী ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার সময়েই এই চুক্তি সই হলো। হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালানোর পাশাপাশি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধ ঘোষণা করেছে। সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে তারা সেই অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা করছে।
ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুথিরা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানিকারকদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে। তেহরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে এসব দেশ এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে ফেলছে হুথিরা, যা তেল রপ্তানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে হুথিদের বিরুদ্ধে গঠিত একটি সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
চার বছর আগে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, যা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও সংঘাত শুরু না হওয়া পর্যন্ত মোটামুটি কার্যকর ছিল।
সামরিক বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় হুথিরা ইয়েমেন সরকারের অন্তত ৫৮ জন সেনাকে হত্যা করেছে। কয়েক বছরের মধ্যে সংঘাতের অন্যতম প্রাণঘাতী দিন ছিল এটি।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং এর ফলে দেশটিতে বড় ধরনের মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।


