বাজেট: কৃষি পেল না প্রত্যাশিত মনযোগ

বাজেট: কৃষি পেল না প্রত্যাশিত মনযোগ
ছবি: এআই
Advertisement
Advertisement

আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দ দেখলে যে কেউ হোঁচট খেতে পারেন। টাকার অঙ্কে বাজেট কিছুটা বাড়লেও দেশের অন্যতম প্রধান এই খাতে আনুপাতিক হাতে বরাদ্দ কমে যাচ্ছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি খাতের জন্য অর্থমন্ত্রী ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখতে যাচ্ছেন, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ৪৫ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকার চেয়ে এক হাজার ৩২ কোটি টাকা বেশি।

তবে বাজেটের আকার বৃদ্ধির তুলনায় এই বরাদ্দ বৃদ্ধির হার একেবারেই নগণ্য। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, সেখানে কৃষিতে বরাদ্দ বাড়ছে কেবল ২ দশমিক ২৫ শতাংশ।

তবে বাজেটের মোট আকারের অনুপাতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিস্যা কমে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল। সেখানে আগামী অর্থবছরে তা কমে দাঁড়াচ্ছে ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশে। অর্থাৎ বাজেটের অনুপাতে কৃষি খাতের অংশীদারত্ব প্রায় শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পাচ্ছে।

জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের বড় অংশ এখনও কৃষিনির্ভর। বরাদ্দের পাশাপাশি বরাদ্দ কমতে যাচ্ছে কৃষির ভর্তুকিতেও। এতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা সে সময় মোট বাজেটের ১০ শতাংশেরও বেশি।

অন্যদিকে এবার শুধুমাত্র কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন

২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি আরও কমে হয় ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।

কৃষিবিদ ও কৃষক সংগঠনগুলোর দাবি, সার, বীজ, সেচ, কৃষিযন্ত্র এবং কৃষিঋণ সহায়তার জন্য আগামী বাজেটে কমপক্ষে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিতে হবে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, চলতি বছরের মতো আগামী অর্থবছরেও কৃষি প্রণোদনা ১৭ হাজার কোটি টাকাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘মোট বাজেট বৃদ্ধির তুলনায় কৃষি বাজেটের বৃদ্ধির হার অত্যন্ত নগণ্য। বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৯ শতাংশ। সেখানে কৃষি বাজেট বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে প্রকৃত অর্থে কৃষি বাজেট কমে গেছে। রিলেটিভ টার্মসে কৃষি খাতের বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে।’

গত কয়েক বছর ধরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি স্থবির অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ৫০ বছরের বেশি সময়ের গড় কৃষি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের বেশি। সেই তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি অনেক কম।’

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও সারের দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এমন অবস্থায় কৃষিতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি কমানো হলে উৎপাদন আরও স্থবির হয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন তিনি।

‘এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে, আমদানি নির্ভরতা বাড়বে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে’, যোগ করেন জাহাঙ্গীর আলম।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির মহাসচিব গোলাম হাফেজ কেনেডি বলেন, ‘আমরা বাজেট ঘোষণার আগেই সুপারিশ করেছিলাম যে কৃষি খাতে মোট বাজেটের অন্তত ১০ থেকে ১২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।’

‘কৃষিতে শুধু টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেই হবে না। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এবং মোট বাজেটের অনুপাতে কৃষির অংশ কতটা বাড়ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এবারের বাজেটে কৃষি খাতের অংশীদারত্ব আরও কমেছে। এটা হতাশার’, বলেন তিনি।

এই কৃষিবিদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্যের দামও বাড়বে। ফলে সরকার যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি শুধু একটি খাত নয়; খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এটি সরাসরি সম্পর্কিত। তাই অন্য খাতের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কৃষিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা প্রয়োজন ছিল।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad