বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা দেশে এখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক এক প্রতিক্রিয়ায় তার এই মূল্যায়ন ব্যক্ত করেছেন।
বৃহস্পতিবার টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে এখনো তৈরি হয়নি।’
বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সক্ষমতা নিয়ে এই বিশাল বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে। তাই শুধু বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, এগুলো কতখানি এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটাই এখন মূল বিষয় বলে তিনি যোগ করেন।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের উচিত হবে বাজেট বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজ একসাথেই চালিয়ে যাওয়া। প্রকৃতপক্ষে ‘ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম’ বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গতি আরও বাড়াতে হবে, তবেই বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কারণ, বাজেট সফল করার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হলো এর বাস্তবায়ন।
বাজেটের লক্ষ্য ও ইতিবাচক দিক
বাজেটের ইতিবাচক দিক নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার বাজেটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের যে রূপরেখা দিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিকভাবে তার প্রতিফলন লক্ষ করা গেছে।
তিনি বলেন, বর্তমানের দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তি বিবেচনা করলে এই ‘রিকভারি অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বেসরকারি বিনিয়োগের পুনরুজ্জীবন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই মূলত এই বাজেট পেশ করা হয়েছে।
এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের চলমান সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে একটি বিনিয়োগবান্ধব ও কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধির দিকে চালিত করা। বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ এবং খাতভিত্তিক গুরুত্বের ক্ষেত্রে এই লক্ষ্যগুলোর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে তিনি টাইমসকে জানান।
এই অর্থনীতিবিদ আরও উল্লেখ করেন, সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সংস্কারের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামাজিক খাতের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজেটে সরকারের বেশ কিছু খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার রয়েছে, যা থেকে স্পষ্ট যে তাদের কাজ করার আকাঙ্ক্ষা আছে। এই প্রেক্ষিতে কোথা থেকে রাজস্ব আদায় হবে এবং তার জন্য কী কী করা হবে, সে সংক্রান্ত বেশ কিছু ‘ফিসক্যাল মেজার’ বা রাজস্ব পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। সরকার বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে এবং সেই অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে।
বাজেট ঘাটতি ও বেসরকারি খাতের ঋণসংকট
ফাহমিদা খাতুন টাইমসকে বলেন, বাজেট ঘাটতি নিজে কোনো বড় সমস্যা নয়, কিন্তু এই ঘাটতি অর্থায়নের উৎসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকার যখন অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় ঋণ নিতে যাবে, তখন বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। অথচ বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলা হয়েছে, যাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিদ্যমান সমস্যা রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো তহবিলের সহজলভ্যতা ও ঋণের খরচ, অর্থাৎ সুদের হার কম থাকা। কিন্তু সুদের হার কমাতে গেলে সরকার যদি নিজেই ব্যাংক থেকে বেশি টাকা ঋণ নিয়ে নেয়, তবে ব্যাংকিং সিস্টেমে লিকুইডিটি বা তারল্য কমে যাবে।
এর ফলে বেসরকারি বা ব্যক্তিখাত যদি তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ না পায়, কিংবা ঋণ পেলেও যদি চড়া সুদে তা নিতে হয়, তবে সাধারণ মানুষ ও উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন না। এটি এই বাজেটের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ বলে তিনি যোগ করেন।
বৈদেশিক অর্থায়ন ও করণীয়
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমাতে সরকারকে চেষ্টা করতে হবে যেন স্বল্প সুদে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ বা বাজেট সহায়তা সংগ্রহ করা যায়। তবে এই বৈদেশিক অর্থ আনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। যদি সেই বৈদেশিক অর্থের সঠিক ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা না যায়, তবে তা উল্টো দেশের জন্য বৈদেশিক ঋণের বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
তাই বৈদেশিক বাজেট সহায়তা এনে তা যদি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যায়, তবেই দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার বিকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন।


