মিয়ানমারের সীমান্ত অঞ্চলে চলমান সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র, মাদক ও জনবল সংগ্রহের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করায় বাংলাদেশে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। কারণ দেশটি এখন একটি নিয়ন্ত্রিত সাধারণ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। শান ও রাখাইন রাজ্যের চিরচেনা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত। এর ফলে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ—এই তিন দেশের সংযোগস্থলের কৌশলগত সীমান্ত অঞ্চল।
আঞ্চলিক গোয়েন্দা তথ্য বলছে, একটি বড় অস্ত্রের চালান ভারতের মিজোরাম হয়ে মিয়ানমারের চিন রাজ্যে ঢোকার কথা রয়েছে। এরপর এটি আরাকান আর্মির প্যালেটওয়া অথবা লাইজা সদর দপ্তরে পৌঁছাতে পারে। পরে সেখান থেকে রাখাইনের উত্তরের বুথিডং-এর দিকে অগ্রসর হতে পারে। বিশ্লেষণ বলছে, এরপর এই অস্ত্রের চালান বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পার্বত্য জেলাগুলোর দিকেও যেতে পারে। পশ্চিমা পরাশক্তির গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিষয়টি নিয়ে অবগত যুক্তরাষ্ট্র।
আরাকান আর্মির প্রধান মেজর জেনারেল তুন মিয়াত নাইং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেছেন, পাশাপাশি আরও কৌশলী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যতদিন সামরিক স্বৈরতন্ত্র থাকবে, ততদিন বিপ্লবও থাকবে।’ অতীতের ভুল ছকের কথা স্বীকার করে নতুন করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
সংগঠনটি এখন মাদক অর্থনীতিতে সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে। সরকারি ও আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, সংঘাতে অর্থ জোগাতে সহায়তা করছে এই মাদক বাণিজ্য। এখন জোখাওথার ও তামু-মোরেহ সীমান্ত চৌকি দিয়ে নিয়মিত প্রবেশ করছে মেথামফেটামিন ও হেরোইনের মতো মাদক। পরে সেগুলো মোটরসাইকেলে করে দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে।
জুলাই গণআন্দোলনের পরে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। তার আগে আগে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনাবেচায় মাদককে কার্যত মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ৩১ অক্টোবর, যখন মিজোরামের আবগারি ও মাদকদ্রব্য দপ্তর চামফাইয়ে ১৫ দশমিক ২১ কেজি মেথামফেটামিন জব্দ করে এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করে, যাদের মধ্যে দুজন মিয়ানমারের নাগরিক। সম্প্রতি মিয়ানমার সীমান্তের কাছে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালান উদ্ধার করেছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী।
পার্শ্ববর্তী মণিপুরে স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, কিছু নিরাপত্তা কর্মীও অর্থের বিনিময়ে এসব চোরাচালানে সহযোগিতা করেন। নিজ পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন বলেন, ‘চেকপোস্টগুলো টোল প্লাজার মতো করে চালানো হয়। এখানে সবাই তার ভাগ পায়।’
এই পথ দিয়ে পাচার হওয়া মাদক গুয়াহাটি, কলকাতা ও দিল্লির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্মকর্তাদের মতে, এর কিছু অংশ বাংলাদেশেও ঢুকছে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, একই চোরাচালান পথ দিয়ে অস্ত্রও আনা-নেওয়া হচ্ছে।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এভাবে মাদক আসাটাই একমাত্র উদ্বেগের কারণ নয়। চলতি বছরের শুরুতে বান্দরবানের থানচিতে আরাকান আর্মির সদস্যদের ইউনিফর্ম পরে জলকেলি উৎসবে অংশ নেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই এলাকা ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) উপস্থিতির জন্য পরিচিত। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাদের আরাকান আর্মির পতাকা উড়িয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে মিশতে দেখা যায়। যদিও সেখানে বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল না।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আরাকান আর্মির সদস্যরা নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে মাদক বাণিজ্য ও দলে স্থানীয় যোদ্ধা নিয়োগের কাজ করছে, বিশেষ করে সেসব এলাকায় যেখানে ইউপিডিএফের প্রভাব বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সীমান্তের দুই পাশে সশস্ত্র নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের নতুন ইঙ্গিত।
এদিকে পাল্টে গেছে আরাকান আর্মির বহির্দেশীয় জোট। ২০২০ সালে চীনের ওপর তাদের নির্ভরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেখান থেকেই তাদের অর্থায়নের ৯৫ শতাংশ আসত বলে ধারণা করা হয়। এখন দলটি ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নতুন পৃষ্ঠপোষকের দিকে ঝুঁকছে। সেকারণে বাংলাদেশের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের কৌশলগত অনুপ্রবেশ বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।
তাছাড়া এই প্রক্রিয়া এমন সময়ে ঘটছে যখন বেইজিং মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করছে এবং চীনের মধ্যস্থতায় একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তিকে স্থিতিশীলতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকা বিভিন্ন বিদ্রোহী নেটওয়ার্ক ও অপরাধকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে লড়াই করছে বাংলাদেশ। তার মধ্যে অস্ত্র, মাদক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান আন্তঃসীমান্ত সংযোগ নতুন করে বাড়াচ্ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নির্বাচন প্রস্তুতির মধ্যে থাকার এই সময়ে।


