শাখা ও এটিএম বুথের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। অন্যদিকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিয়ে বাড়ছে গ্রাহকদের ক্ষোভ। এমনকি গ্রাহকের অজান্তেই কার্ড ও ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। ঠিক এমন সময়ে বাংলাদেশে নিজেদের খুচরা ব্যাংকিং (রিটেইল ব্যাংকিং) ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা বিক্রি করে দেওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করেছে বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।
প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা মূল্যের এই ব্যবসা কেনার বিষয়ে একাধিক দেশীয় ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্যানচার্ট। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)। তবে স্ট্যানচার্ট শর্ত দিয়েছে, যে ব্যাংকই এই ব্যবসা কিনবে, তাকে স্ট্যানচার্টের খুচরা ও কার্ড বিভাগে কর্মরত প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব নিতে হবে।
অবশ্য বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, কোনো চূড়ান্ত ক্রেতা ঠিক হয়নি কিংবা আনুষ্ঠানিক দরপত্রও আহ্বান করা হয়নি।
জানা গেছে, স্ট্যানচার্টের এই ব্যবসা কেনার আলোচনা চালিয়ে নিতে সিটি ব্যাংক ইতিমধ্যে একটি গোপনীয়তা রক্ষা চুক্তিতে (এনডিএ) সই করেছে। ব্র্যাক ব্যাংকও এমন চুক্তি সই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে পূবালী ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক একটু দেখে-শুনে এগোতে চাইছে।
এর আগে ২০০৫ সালেও আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিলে তাদের কার্ড ব্যবসাটি কিনে নিয়েছিল সিটি ব্যাংক।
সামগ্রিক বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘স্ট্যানডার্ড চার্টার্ডের পক্ষ থেকে এমটিবি একটি প্রস্তাব পেয়েছে। তবে এ ধরনের কেনাবেচা বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয়। কথাবার্তা এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।’
তবে গোপনীয়তা রক্ষা চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সিটি ব্যাংকের সিইও মাশরুর আরেফিন।
ব্যবসা বিক্রির এই সম্ভাবনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির ইচ্ছার কথা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে। তারা কার কাছে বা কীভাবে এটি বিক্রি করবে, তা তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে ব্যাংকটি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকে নজর রাখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে ব্যবসা বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে সরাসরি কিছু বলতে রাজি হয়নি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। বিষয়টিকে ‘বাজারের গুজব’ হিসেবে উল্লেখ করে তারা জানায়, এ ধরনের গুজবে ব্যাংক সাড়া দেয় না।
এক লিখিত বিবৃতিতে ব্যাংকটির করপোরেট অ্যাফেয়ার্স এবং ব্র্যান্ড ও মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটোপি দাস চৌধুরী বলেন, ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ নিয়মিতভাবেই বিশ্বজুড়ে তাদের ব্যবসা পর্যালোচনা করে থাকে। যেসব খাতে গ্রাহকদের আলাদা ও সেরা সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকে, সেখানেই ব্যাংকের সম্পদ ও মনোযোগ নতুন করে কাজে লাগানো হয়।’
বাংলাদেশে ব্যাংকের ১২০ বছরেরও বেশি সময়ের যাত্রার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দেশের বাজারে তাদের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাদের দৈনন্দিন সেবা স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। ব্যাংকিং কার্যক্রমে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা হয়নি।’
তবে ব্যবসা বিক্রি হয়ে গেলে গ্রাহকদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা, বর্তমানের লেনদেন কিংবা জালিয়াতির অভিযোগগুলো কীভাবে সামাল দেওয়া হবে—সে বিষয়ে ব্যাংকটি কিছু জানায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দরদাম করে ব্যবসাটি বিক্রি হতে পারে। ব্যবসার সার্বিক মূল্যায়ন করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হতে পারে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান।
ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুচরা গ্রাহক এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে তাদের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ২৮ শতাংশ। একই সময়ে গ্রাহকদের জমা করা আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
তবে গত কয়েক বছরে স্ট্যানচার্টের সেবার পরিসর বেশ ছোট হয়ে এসেছে। পাঁচ বছর আগেও দেশে যেখানে ব্যাংকটির ২৪টি শাখা ছিল, এখন তা কমে ১৮টিতে নেমেছে। একইভাবে কমেছে এটিএম ও অন্যান্য ডিজিটাল বুথের সংখ্যা।
এ ছাড়া নতুন হিসাব বা অ্যাকাউন্ট খুলতে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জমা রাখার শর্ত চাপিয়েছে ব্যাংকটি। সম্প্রতি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর সুবিধাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বহুজাতিক এই ব্যাংকটির বিরুদ্ধে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগও এসেছে।
গত আগস্টে খোকন দেবনাথ নামের এক গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিত অভিযোগে জানান, ২১ আগস্ট ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ’ (এনপিএসবি)-এর মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা করে দুই দফায় মোট ৬ লাখ টাকা তার হিসাব থেকে তুলে নেওয়া হয়।
তিনি জানান, এই লেনদেন তিনি নিজে করেননি। যে অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে সেটিও তার তালিকায় যুক্ত করা ছিল না। ফোনে ই-ট্যাক এবং এসএমএস পেলেও তিনি ব্যাংক থেকে কোনো কনফার্মেশন ইমেইল পাননি।
এর আগে গত বছরের আগস্টে আরও বড় এক জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। স্ট্যানচার্টের ৫৪ জন গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই তাদের কার্ড থেকে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে মোট ২৭ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়।
সে সময় ৫০ হাজার টাকা করে একাধিকবার টাকা স্থানান্তরিত হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, ফোনে এককালীন পাসওয়ার্ড (ওটিপি) আসলেও তা তারা কাউকেই জানাননি।
ওই ঘটনার পর ব্যাংকটি কার্ড থেকে বিকাশ ও নগদে টাকা পাঠানোর সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। পরে তদন্তের পর ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশি-বিদেশি কারিগরি টিম পরীক্ষা করে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় কোনো ত্রুটি পায়নি।
এর বাইরেও ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ বন্ধ থাকা, এটিএম বুথ না পাওয়া এবং কার্ড সেবা নিয়ে গ্রাহকদের প্রচুর ক্ষোভ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক গ্রাহক লিখেন, জরুরি প্রয়োজনে তাকে অনেক দূরে গিয়ে এটিএম বুথ খুঁজতে হয়েছে। তাছাড়া প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ডিজিটাল সেবা বন্ধ থাকার বার্তা পাঠানো হয়। ফেসবুক ও লিঙ্কডইনে ঘুরে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কেন স্থানীয় ব্যাংকগুলো এই ব্যবসা কিনতে চায়?
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের খুচরা ব্যবসার প্রধান আকর্ষণ শুধু জমা আমানত বা ঋণ নয়, আসল আকর্ষণ হলো তাদের গ্রাহক তালিকা।
ব্যাংকটির বেশির ভাগ গ্রাহকই উচ্চ আয়ের। দেশি-বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করেন এবং নানা ধরনের সেবা নেন। মূলত এই প্রিমিয়াম গ্রাহকদের পেতেই ব্যাংকটির ব্যবসার ওপর নজর পড়েছে দেশীয় ব্যাংকগুলোর।
ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক ইতিমধ্যে স্ট্যানচার্টের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছে। এই ব্যবসা কেনার দৌড়ে আছে পূবালী ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক।
বর্তমানে সিটি ব্যাংকের আমানত প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা এবং খুচরা ঋণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা এবং খুচরা ঋণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। স্ট্যানচার্টের বিশাল গ্রাহকভিত্তি যুক্ত হলে যেকোনো ব্যাংকের ব্যবসাই রাতারাতি অনেক বড় হয়ে যাবে।
তবে স্ট্যানচার্টের ১ হাজার ৫০০ কর্মীর দায়িত্ব নেওয়ার শর্তটি অনেক ক্রেতা ব্যাংককেই কিছুটা ভাবনায় ফেলেছে।
বিশ্বজুড়ে কৌশল বদলের অংশ
বাংলাদেশে খুচরা ব্যাংকিং গুটিয়ে নেওয়া স্ট্যানচার্টের বৈশ্বিক কৌশলেরই একটি অংশ। গত কয়েক বছর ধরেই ব্যাংকটি সাধারণ গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা কমিয়ে দিয়ে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা (ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট) ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। এতে লাভ বেশি হয়।
ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের বাজার থেকেও খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসার বড় অংশ বিক্রি করে দিয়েছে বা কমিয়ে এনেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই ব্যাংক।
১৯০৫ সাল থেকে এই অঞ্চলে ব্যবসা করা ব্যাংকটি ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগের বছর ২০২৪ সালেও তারা ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।


