সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও সংবিধান অনুযায়ী তার সদস্য পদ খারিজ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজ্ঞরা।
তারা বলছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা অন্য দলে যোগ দিলেই কেবল তার সদস্যপদ খারিজ হতে পারে। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কারের পরেও সংসদ সদস্য পদ থেকে যাওয়ার উদাহরণ আছে।
ভাড়া করা কক্ষে স্বল্পবয়স্ক তরুণীর সঙ্গে ভিডিও ভাইরালের পর উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জামায়াত বুধবার গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানায়, যদিও আগের দিন দলের অনুসারীরা ফেসবুকে দাবি করতে থাকেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিডিও ছড়ানো হয়েছে।
পরে গাজী নজরুল দাবি করেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং গত ১৭ জুন তারা বিয়ে করেছেন। এ বিষয়ে একটি কাবিননামাও সংবাদকর্মীদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু পরে ফাঁস হয়, সেই কাবিননামা মঙ্গলবারই লেখা হয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুবার কাজী বদরুল আলম মো. বাকী বিল্লাহ জানিয়েছেন, সোমবার রাতে তাকে ফোন করে কাবিননামা লেখতে বলা হয়। বিয়ে তিনি পড়াননি।
এই বিতর্কের মধ্যে বুধবার বিকালে জামায়াতের জরুরি বৈঠকে নৈতিক স্খলনের দায়ে গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করার কথা জানানো হয় এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘দল থেকে বহিষ্কার হলেও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ কোনো ঝুঁকিতে নেই। এমনকি নৈতিক স্খলনের কারণেও নির্বাচন কমিশনের সদস্যপদ রদ করার মতো কোনো ব্যবস্থা সংবিধানে নেই।’
অতীতে দল থেকে বহিষ্কারের পরেও সংসদে সদস্য থাকার নজির আছে।
নবম সংসদের গাজী নজরুলের আসন সাতক্ষীরা-৪ এরই সদস্য এইচ এম গোলাম রেজা জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কারের পরেও সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন। সে সময় তার দল জাতীয় পার্টি সদস্য পদ বাতিলে স্পিকারকে চিঠি দিয়েও সফল হয়নি।
দশম সংসদের সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকেও আওয়ামী লীগ বহিষ্কার করেছিল, তবে তার সংসদ সদস্য পদ যায়নি। পরে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া টাইমসকে জানিয়েছেন, জামায়াত নৈতিক স্খলনের কারণে বহিষ্কার করায় স্পিকার চাইলে বিষয়টি রেফারেন্স হিসেবে নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে পারেন। কমিশন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সিদ্ধান্ত নিলে তার সদস্যপদ বাতিল হলেও হতে পারে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শরীফ ভূঁইয়া টাইমসকে বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে। কিন্তু গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে এ দুটি শর্তের কোনোটিই প্রযোজ্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য স্বেচ্ছায় দল ছাড়লে তার পদ থাকে না। কিন্তু এর চেয়েও গুরুতর পরিস্থিতি হলো, কোনো সদস্য যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দলই যদি তাকে নৈতিক স্খলনের কারণে বহিষ্কার করে; তবু তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় না।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নির্বাচনি আইন বিশেষজ্ঞ ফয়জুল্লাহ ফয়েজও একই মত দেন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘দল বহিষ্কার করলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে-এ রকম কোনো আইন বা বিধান এখন পর্যন্ত নেই। তবে সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় পদত্যাগের পাশাপাশি বহিষ্কারকেও অন্তর্ভুক্ত করে দল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে আমি মনে করি।’
গাজী নজরুলের ঝুঁকি অবশ্য কাটছে না। তার ১৭ জুনের বিয়ের দাবি এবং সেটি ২১ জুলাই নিবন্ধন হয়ে থাকলে সেটি ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কারণ, এই আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন না করলে বরের দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আর নৈতিক স্খলনজনিত কারণে দুই বছরের সাজা হলে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদ থাকার সুযোগ নেই।
আবার গাজী নজরুল স্ত্রী বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তার এবং সালিশ পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া বিয়ে করেছেন, মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ অনুযায়ী এটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের সাজা এক বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।


