মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নের দুটি দুর্গম চরে স্বাস্থ্যসেবার অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন দুই হাজার মানুষ। অর্থনীতি, কৃষি ও মৎস্যসম্পদে ভূমিকা রাখলেও তারা চিকিৎসাসেবা থেকে চরম বঞ্চিত। ২০২২ সাল থেকে নতুন করে এই চরে বসতি শুরু হয়। চার বছর ধরে এখানে কোনো হাসপাতাল বা স্থায়ী চিকিৎসক নেই।
নদীপথে খেয়া পারাপার এখানকার মানুষের একমাত্র যোগাযোগব্যবস্থা। চরের অধিকাংশ বাসিন্দা জেলে ও কৃষক। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং স্বাস্থ্য খাতে অবহেলায় জীবন দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা বা ওষুধ সরবরাহ নেই। সামান্য অসুখে মানুষ ঝাড়ফুঁক কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করেন। জরুরি রোগীর জন্য শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়াই একমাত্র ভরসা।
পদ্মা নদী পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র স্রোত ও নৌযানের স্বল্পতায় রোগী পরিবহন করা যায় না। রাতের বেলায় গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে নদী পার হওয়া অসম্ভব। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নেই কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্স।
গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন। গর্ভকালীন পরীক্ষা বা নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করেন। ফলে মা ও নবজাতকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে।
চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম বলেন, ‘এখানে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক কিছুই নেই। গত মাসে প্রসববেদনা উঠলে রাতে নৌকা পাওয়া যায়নি। অনেক কষ্টে ভোরে নদী পার হয়ে পাঁচ্চর হাসপাতালে যেতে হয়েছে।’
শ্বাসকষ্টে ভোগা বৃদ্ধ জব্বার মোল্লা জানান, দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। নদী পার হতে সময় লাগে। সরকার একটি হাসপাতাল স্থাপন করলে কষ্ট কমত।
তাসলিমা সালমা বিবি নামে দুই সন্তানের মা বলেন, ‘ছেলের জ্বর ও ডায়রিয়া হলে খুব ভয় লাগে। এখানে কোনো ডাক্তার নেই, ওষুধও মেলে না। বাধ্য হয়ে স্থানীয় কবিরাজের কাছে যেতে হয়।’
নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, ‘চরের মানুষ মৌলিক চাহিদা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। আমরা চিকিৎসকসহ আধুনিক সুবিধাসংবলিত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক চাই।’
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারী জানান, সরকারি কোনো স্বাস্থ্যসেবা মিলছে না। গুরুতর অসুস্থ হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিক, পর্যাপ্ত ওষুধ ও নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা প্রয়োজন।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও জনবলসংকটের কারণে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন সেবা দিচ্ছেন। নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনে ৩০ শতাংশ জমি প্রয়োজন। ইউএনও কমিটির মাধ্যমে জমি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।


