হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস‘-এর আলোচনায় প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো সাহিত্য থেকে ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে রূপান্তরের চিরায়ত সংকট।
হুমায়ূন আহমেদের কাজের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি আরও গভীর হয়। এর কারণ হলো, তার পাঠকগোষ্ঠী যখন সিনেমা দেখতে আসে, তখন তারা কেবল একটি গল্প দেখতে চায় না; তারা তাদের নিজস্ব কল্পনার জগতের সঙ্গে চলচ্চিত্রটির মিল খুঁজে পেতে চায়। পাঠক হিসেবে তারা গল্পের ভেতরে যে ভিজ্যুয়াল তৈরি করে নেয়, সেটিই তাদের কাছে ‘মূল’ বা ‘অরিজিনাল’ রূপে গণ্য হয়।
ফলস্বরূপ, যখন সেই একই গল্পকে তারা পর্দায় দেখে, তখন দর্শকের মনোযোগ গল্পের অভিজ্ঞতা থেকে সরে গিয়ে সিনেমাটির দৃশ্যপট তাদের কল্পনার সঙ্গে কতোটা মিলছে, অথবা কোথায় কোথায় পার্থক্য তৈরি হয়েছে, এমন সব তুলনার দিকে ধাবিত হয়।
হুমায়ূন আহমেদের কাজের ক্ষেত্রে, কিংবা সাধারণভাবে যেকোনো ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বা উপন্যাসভিত্তিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে, বই থেকে পর্দায় রূপান্তর একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জটি আরও বেশি তীব্র। এর প্রধান কারণ হলো, হুমায়ূন আহমেদ একজন লেখক হিসেবে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষের আবেগের অংশ হয়ে উঠেছেন।
তার সৃষ্টিকর্ম—বই, নাটক ও চলচ্চিত্র—বিশাল সংখ্যক দর্শক-পাঠকের কাছে পৌঁছানোয় তাদের আবেগগত সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গভীর।

এ কারণেই যখন তার কোনো গল্প চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়, তখন দর্শকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায়শই এই প্রশ্ন তোলে যে, তাদের নিজস্ব কল্পনার সঙ্গে চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়ালাইজেশন কেন মেলেনি!? ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, হুমায়ূন আহমেদের টেক্সট নিয়ে নির্মিত অনেক চলচ্চিত্রের সমালোচনার মূল সুরটিও এখানেই নিহিত। দর্শক মূলত এই বিষয়টিতেই প্রধান আপত্তি জানায় যে, উপন্যাস থেকে বাস্তব ভিজ্যুয়ালে রূপান্তরের সময় কোথায় কোথায় বাধা এসেছে বা পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসটি নিজেই এমন একটি কাজ, যা একটি নির্দিষ্ট স্পেস—একটি ট্রেনের ভেতরে—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করে। এটি বড় কোনো ঘটনাভিত্তিক বা প্লট-ড্রিভেন গল্প নয়; বরং এটি মানুষের ভেতরের জগৎ, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সন্দেহ, সহমর্মিতা এবং মুহূর্তগত সংযোগ নিয়ে নির্মিত। এ ধরনের উপন্যাসকে চলচ্চিত্রের মত শক্তিশালী একটি ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে রূপ দেওয়া, নির্মাতাদের জন্য খুব স্বাভাবিক প্রথম পছন্দ নাও হতে পারে। কারণ, এখানে নাটকীয় ঘটনাবলির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ভেতরের পরিবর্তন এবং সম্পর্কের সূক্ষ্মতা।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তানিম নূরের এই গল্পটি বেছে নেওয়া এবং এটি নিয়ে কাজ করার আগ্রহটিই একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল সিদ্ধান্ত। গল্পের মূল কাঠামোটি অত্যন্ত সাদামাটা হলেও এর গভীরতা এবং বহুমাত্রিকতা এটিকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। চলচ্চিত্র নির্মাতার এই নির্বাচন কেবল একটি আখ্যানের প্রতি আকর্ষণ নয়, বরং জীবন ও মানুষের সম্পর্কের একটি বিশেষ দিককে তুলে ধরার অঙ্গীকার।
এখানে একটি ট্রেনের ছুটে চলা আছে—কিন্তু এই ছুটে চলার ভেতরেই আছে বহু মানুষের জীবন, তাদের সংকট, তাদের অভিজ্ঞতা এবং তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া অদ্ভুত এক সংযোগ। ট্রেনটি কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছানোর বাহন নয়, এটি এক চলন্ত ক্ষুদ্র বিশ্ব। এই বিশ্বের যাত্রীরা প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত গল্প, আশা-নিরাশা, এবং না বলা বেদনা নিয়ে উঠেছে। তাদের এই সহাবস্থানই গল্পের মূল চালিকাশক্তি।
ট্রেনের কম্পার্টমেন্টের সীমিত পরিসরে, ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক পটভূমি ও মানসিকতার মানুষগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে কাছাকাছি আসে। এক যাত্রীর নীরব দীর্ঘশ্বাস হয়তো অন্যজনের কৌতূহল জাগায়, একটি ছোট সাহায্য হয়তো অচেনা একজনের মনে গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি করে। এই মিথস্ক্রিয়াগুলো কোনো পূর্বনির্ধারিত বা গতানুগতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না; বরং এটি মুহূর্তের আবেগ, প্রয়োজন এবং মানবিক সহানুভূতির ফল। এটি কোনো নির্দিষ্ট ‘রিলেটিভ’ গল্প নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক যাত্রা—যেখানে মানুষ নিজেদের জীবন থেকে নিয়ে আসা নানা অনুভূতিকে একে অপরের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
এই গল্পের কেন্দ্রে কোনো একক প্রধান চরিত্র বা একটি নির্দিষ্ট ঘটনার সমাধান নেই। বরং, এটি জীবনের একটি খণ্ডচিত্র—অস্থায়ী সংযোগের মাধ্যমে কীভাবে মানব-অনুভূতি প্রবাহিত হতে পারে তার একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ। প্রতিটি যাত্রীই যেন চলমান জীবনের একটি প্রতীক, এবং ট্রেনটি হলো সেই জীবনের পথ।
এ যাত্রা ধীরে ধীরে একটি কন্টিনিউয়াস আবেগীয় প্রবাহ তৈরি করে, যা চলচ্চিত্রটিকে একটি ‘জার্নি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই আবেগীয় প্রবাহ তৈরি হয় ছোট ছোট মানবিক মুহূর্ত, ক্ষণস্থায়ী সংলাপ, চোখের ভাষা এবং নীরবতার মধ্য দিয়ে। যখন চলচ্চিত্রটি শেষ হয়, দর্শক কেবল একটি গল্প দেখে শেষ করে না; বরং তারা এক গভীর জীবনবোধের অভিজ্ঞতা লাভ করে। এই অভিজ্ঞতা তাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন নিজেও একটি অবিরাম যাত্রা, যেখানে অচেনা মানুষের সঙ্গে মুহূর্তের সংযোগগুলোও জীবনে নতুন অর্থ ও গভীরতা যোগ করতে পারে। নির্মাতার এই সিদ্ধান্ত চলচ্চিত্রটিকে এক চিরায়ত মানবিক আবেদনের স্তরে উন্নীত করেছে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’-কে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আরও একটি দিক স্পষ্ট হয়: চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত সচেতনভাবে একটি নির্দিষ্ট সময়কালকে তুলে ধরেছে। আমাদের নাগরিক জীবনের ট্রেনযাত্রার সেই অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে যখন এখনকার মতো স্মার্টফোন-নির্ভর বিচ্ছিন্নতা ছিল না—সেই সময়টিকে চলচ্চিত্রটি নিপুণভাবে ধারণ করেছে। এখানে আমরা বাটন ফোনের ব্যবহার, নেটওয়ার্কের অনিশ্চয়তা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—মানুষের মধ্যে সরাসরি কথোপকথন দেখতে পাই। যাত্রীরা ক্রমাগত স্ক্রল না করে বরং একে অপরের সঙ্গে, এমনকি অপরিচিতদের সঙ্গেও, আলাপচারিতায় মগ্ন। এই দিকটিই আসলে চলচ্চিত্রটিকে নীরবে একটি ‘পিরিয়ড ড্রামা’-র আবহ এনে দেয়, যদিও এটি সরাসরি নিজেকে সেই ঘরানায় অন্তর্ভুক্ত করেনি।
চলচ্চিত্রটির সময়কাল শুধু দৃশ্যের বিশদেই নয়, প্রেক্ষাপটেও কাজ করে—রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অপ্রত্যাশিত ক্ষমতার পতনের মতো ঘটনা ব্যক্তিগত গল্পের সঙ্গে মিশে যায়, ফলে এটি একটি সময়ের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। সংলাপের একটি ইন্টারেস্টিং দিক হলো এর ভাষাগত দ্বৈততা। গল্পটি অতীতের হলেও চরিত্রদের প্রকাশভঙ্গি অনেকটা জেন-জি’দের মতো, যা প্রথমে অমিল তৈরি করলেও পরে তা চলচ্চিত্রের শক্তিতে পরিণত হয়। এই সমসাময়িক ভাষা দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করে এবং গল্পটিকে বর্তমানের অভিজ্ঞতা হিসেবে অনুভব করতে সাহায্য করে। চলচ্চিত্রটির প্রধান শক্তি হলো এর চরিত্র নির্মাণ। চরিত্রগুলো একমাত্রিক নয়, বরং শুরু থেকেই মানুষ হিসেবে তাদের মধ্যে সন্দেহ, অস্বস্তি ও নেতিবাচক দিক থাকলেও, ধীরে ধীরে আমরা তাদের ভেতরের স্তরগুলো দেখতে পাই।
চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো সহজলভ্য সিদ্ধান্তে বাধা থাকে না। চলচ্চিত্রের শুরুতে মোশাররফ করিমের চরিত্রটির ধূমপান বা অন্যের অস্বস্তির তোয়াক্কা না করার কারণে, সেটিকে বিরক্তিকর মনে হলেও, ধীরে ধীরে তার ভেতরের মানুষটিকে আবিষ্কার করায় তার আচরণ গৌণ হয়ে পড়ে এবং দর্শক তার সঙ্গে সংযুক্ত হয়। একইভাবে, শরীফুল রাজের আপাত অদ্ভুত বা বিরক্তিকর ম্যাজিক দেখানো চরিত্রটির মানবিক দিকগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর তার পূর্বের আচরণ নতুন অর্থ পায়। শ্যামল মাওলার প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রটিও বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে দায়িত্ববোধ ও অন্যের সুরক্ষায় পাশে এগিয়ে আসায় দর্শকের সহানুভূতি অর্জন করে।

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসগুলোতে সাধারণত এক ধরনের সূক্ষ্ম হাস্যরস থাকে—যেটা জোর করে তৈরি করা কোনো কমেডি নয়, বরং চরিত্র, পরিস্থিতি এবং তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভেতর থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়। বিভিন্ন সামাজিক স্তর, ভিন্ন ব্যক্তিত্ব, আলাদা মূল্যবোধ—এই সবকিছুকে একসঙ্গে একটি পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে তিনি এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি করেন, যেখানে খুব বড় কোনো নাটকীয় ঘটনা না ঘটলেও, পাঠক হিসেবে আমরা অজান্তেই হেসে ফেলি।
এই হাসিটা আসে কোনো বড় সংঘাত থেকে নয়, বরং ছোট ছোট অস্বস্তিকর নীরবতা, ভুল বোঝাবুঝি, কিংবা চরিত্রের অদ্ভুত কিন্তু বাস্তব আচরণ থেকে। এই ধরনের হাস্যরসকে অনেকটা ‘শুষ্ক’ বা ‘নিরাবেগ’ হাস্যরস বলা যায়—যেখানে অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া নেই, বরং সংযত, প্রায় নিঃশব্দ এক ধরনের মজা কাজ করে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর ক্ষেত্রেও এই হাস্যরসের উৎসটি ঠিক এই জায়গাতেই। এখানে বড় কোনো নাটকীয় সংঘাত নেই, নেই তীব্র মুখোমুখি দ্বন্দ্ব; বরং আছে চরিত্রগুলোর মধ্যে ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি, তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, এবং নতুন মানুষের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়া। এই মিথস্ক্রিয়াগুলো যখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়, তখন দর্শকও সেই পর্যবেক্ষণের অংশ হয়ে যায়। চরিত্রগুলোর সীমাবদ্ধতা, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা, কিংবা তাদের নিজস্ব বিশ্বাস—সবকিছুই এক ধরনের পর্যবেক্ষণধর্মী ভঙ্গিতে সামনে আসে, যা থেকে এই সূক্ষ্ম হাস্যরস জন্ম নেয়। আর এই কারণেই, তীব্র সংঘাত না থাকা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটি দর্শকের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে—এক ধরনের স্বস্তিদায়ক, মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে।
চলচ্চিত্রটির শেষভাগেও সংঘাত বা প্রতিশোধের বদলে মানবিকতা বজায় থাকে, যেমন শ্যামল মাওলার চরিত্রটির সংকট উত্তরণের পর কোনো প্রতিহিংসাপরায়ণতা দেখা যায় না। চরিত্রগুলোর বিন্যাস ও উপস্থাপনাই এর প্রধান শক্তি; মোশাররফ করিম ও শ্যামল মাওলার চরিত্র স্বাভাবিকতা ও মানবিকতায় স্মরণীয়। এখানে চরিত্রগুলো নয়, বরং অপরিচিতদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়, সন্দেহ দূর হয়ে যোগাযোগ ও সহমর্মিতা তৈরি হয়। এই মিথস্ক্রিয়া থেকেই চলচ্চিত্রের ‘ফিল-গুড’ আবহ তৈরি হয়, যা, শিক্ষার্থী, ডাক্তার, পকেটমার, সন্তান হারানো বাবাদের মতো আমাদের পরিচিত বাস্তব বিভিন্ন চরিত্রের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও জীবন পরিবর্তনের গল্প তুলে ধরে।
অভিনয়ের দিক থেকে এই চলচ্চিত্রের প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীই দারুণ ছিল। বিশেষ করে, চঞ্চল চৌধুরী, সাবিলা নূর এবং আজমেরী হক বাঁধন, অত্যন্ত স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করেছেন। এমনকি ছোট চরিত্রগুলোও দর্শকদের মনে আলাদা করে দাগ কেটেছে। লাবণ্য চৌধুরীর ‘রুবী’, আজমেরী হক বাঁধনের ‘সুরমা’ এবং সাবরিন আজাদের ‘যমুনা’ চরিত্রের পরিণত হয়ে ওঠা ছিল প্রশংসনীয়। তবে শামীমা নাজনীনের অভিনয় বিশেষভাবে সবার নজর কাড়ার মত। শরীফুল রাজ বা ড. আশহাবের মায়ের চরিত্রে তার রূপায়ণ ছিল হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রের সবচেয়ে সার্থক প্রতিফলন। এছাড়াও, নুহাশ হুমায়ূনের ভয়েস-ওভার চলচ্চিত্রটিকে এক অনন্য, প্রায় আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত করেছে।
চলচ্চিত্রটির সঙ্গীত ব্যবহারও আলাদাভাবে চোখে পড়ে। তানিম নূরের নির্মাণে আগে থেকেই জনপ্রিয় গানগুলোকে নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করার একটি প্রবণতা আছে। ফলে যখন আইয়ুব বাচ্চুর ‘উড়াল দেব আকাশে’, আর্টসেলের ‘চাইতেই পারো’ বা অর্ণবের কণ্ঠে “মাঝে মাঝে তব দেখা পাই” বাজে, তখন সেই গানগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলোও একসঙ্গে ফিরে আসে। কিছু কিছু জায়গায় গান ব্যবহার যেমন ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’য় এক ধরনের কমিক্যাল বা রিমিক্সধর্মী টোনও তৈরি হয়েছে, যা এই প্রজন্মের সংস্কৃতির প্রতিফলন। তবে এটাও মনে হয়েছে, কিছু মুহূর্তে যদি আরও একটু নীরবতা থাকত, তাহলে হয়তো পারফরম্যান্সগুলো আরও গভীরভাবে ধরা দিত।
চিত্রগ্রহণে বরকত হোসেন পলাশ ট্রেনের সেটের সীমাবদ্ধতার ভেতরেও এক ধরনের গতিময়তা তৈরি করেছেন। প্রতিটি দৃশ্যে ক্যামেরা শুধু দেখছে না, বরং গল্পের সঙ্গে চলমান রয়েছে। সম্পাদনায় সালেহ সোবহান অনীম দৃশ্যগুলোকে এমনভাবে যুক্ত করেছেন যাতে সংলাপগুলো এক চরিত্র থেকে আরেক চরিত্রে রিলের মতো প্রবাহিত হয়—যেন একটি ধারাবাহিক কথোপকথনের ভেতরেই পুরো চলচ্চিত্রটি গড়ে উঠছে। শিল্প নির্দেশনায় রাজিম আহমেদের প্রয়াস অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
পোশাক পরিকল্পনায় তানিয়া রহমান এবং শব্দ গ্রহণ ও বিন্যাসে শৈব তালুকদারের কাজও প্রশংসনীয়। আমাদের দেশে ২০০০ সালের শুরুর দিকে প্যাকেজ নাটকের শুরুর সময়টিতে একদল স্বাধীন নির্মাতা নতুন গল্প বলার ভাষা খুঁজছিলেন। পরিবার, আত্মীয়, বহু চরিত্র—এইসব নিয়ে তারা এক ধরনের সমষ্টিগত গল্প নির্মাণের চর্চা করছিলেন, যা অনেকাংশেই চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি প্রস্তুতিপর্ব ছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এই ধারাটি ভেঙে পড়ে। ধীরে ধীরে বাজেট কমতে থাকে, চরিত্র কমতে থাকে, লোকেশন সীমিত হয়ে আসে—ফলে গল্পের ভেতরের সেই বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যায়। একসময় দেখা গেল, গল্প আর দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারছে না। কারণ মানুষের জীবনের যে বহুবর্ণ বাস্তবতা—মা, বাবা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি—এই সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে গল্প থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। দর্শক তখন সেই গল্প থেকে দূরে সরে যায়।
পরবর্তীতে ইউটিউব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থানের ফলে যখন নতুন করে আয়ের পথ তৈরি হলো, তখন আবার পারিবারিক গল্পের চাহিদা ফিরে আসতে শুরু করে। কারণ খুব দ্রুতই বোঝা গেল, এই অঞ্চলের দর্শকদের মধ্যে পারিবারিক আবহের গল্পের একটি বিশাল চাহিদা রয়েছে। মাঝখানে অনেক শিল্পী-কলাকুশলীকেই আফসোস করতে শোনা গেছে—গল্পে এখন আর মা-বাবা বা পরিবারের বড়দের জায়গা নেই, কারণ তাদের রাখলে খরচ বাড়ে।
এই প্রবণতাটি শুধু নাটকে নয়, আমাদের চলচ্চিত্রেও প্রতিফলিত হয়েছিল। ফলে ধীরে ধীরে গল্পগুলো একমুখী হয়ে পড়ে—কখনো শুধু প্রেম, কখনো শুধু সহিংসতা। জীবনের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য, সম্পর্কের স্তর এবং একটি সামাজিক বাস্তবতার জটিলতা—এসবই অনুপস্থিত হতে থাকে। এই অনুপস্থিতির ফলে গল্পের ভেতরে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়।
এ জায়গা থেকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর গুরুত্বটি আরও পরিষ্কার হয়। এখানে বহুস্তরীয় গল্প নির্মাণ এবং সমষ্টিগত চরিত্র বিন্যাসের মাধ্যমে আবার সেই হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক আবহটি ফিরে আসে। এই চলচ্চিত্রে আমরা একসঙ্গে দেখি—একজন মা, একজন বাবা, একজন চাচা, একজন পকেটমার, একজন রেলকর্মী, একজন ভিডিওগ্রাফার, একজন গায়ক, ক্ষমতার ছায়ায় চলা এক শ্যালিকা, কিংবা একজন রাজনৈতিকভাবে সচেতন নারী, যিনি গৃহিণী হয়ে গেলেও তার রাজনৈতিক বোধ হারাননি। একই সঙ্গে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া তরুণ-তরুণীরা, যাদের মধ্যে এখনও এক ধরনের নৈতিক স্বচ্ছতা ও সরলতা কাজ করে।
বৈচিত্র্যময় চরিত্রগুলোর উপস্থিতিই চলচ্চিত্রটিকে একটি বৃহত্তর মানবিক পরিসরে নিয়ে যায়। এখানে প্রত্যেক দর্শকই কোনো না কোনো চরিত্রের সঙ্গে নিজের সংযোগ খুঁজে নিতে পারে। ফলে চলচ্চিত্রটি শুধু একটি গল্প হয়ে থাকে না; এটি একটি সমষ্টিগত অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। আর এই কারণেই, অনেকদিন পর আবার এমন একটি চলচ্চিত্র দেখা যায়, যেখানে পরিবার, সম্পর্ক এবং সামাজিক বাস্তবতার বহুমাত্রিকতা একসঙ্গে ফিরে এসেছে—যা আমাদের সমসাময়িক গল্প বলার ভেতরে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিল।
সবশেষে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই—এটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা পরিবার নিয়ে একসঙ্গে দেখা যায়। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত দর্শকদের একটি বড় অংশ আছে, যারা সিনেমা হলে যেতে চায়, কিন্তু বিষয়বস্তুর কারণে অনেক সময় দ্বিধায় থাকে। এই চলচ্চিত্র সেই দ্বিধা ভেঙেছে। এখানে কোনো অস্বস্তিকর মুহূর্ত নেই, বরং পরিচিত আবেগ, পরিচিত গান, পরিচিত মানুষ—সবকিছু মিলিয়ে একটি স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। এই কারণেই দর্শকের মধ্যে মুখে মুখে এর প্রচারে রিপিট অর্ডিয়েন্স তৈরি হচ্ছে। একবার দেখার পরও মনে হয়, আবার দেখলে নতুন কিছু ধরা পড়বে। আর এই পুনরাবিষ্কারের সম্ভাবনাই হয়তো ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-কে একটি দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত করবে।
লেখক : আবু শাহেদ ইমন, চলচ্চিত্র নির্মাতা


