চলতি গ্রীষ্মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো যখন যৌথভাবে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করবে, তখন পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর থাকবে কিলিয়ান এমবাপের গতি, ভিনিসিয়াস জুনিয়রের পায়ের জাদু আর আর্লিং হালান্ডের গোল করার সহজাত দক্ষতার ওপর। কিন্তু মাঠের খেলায় এমন আরেকটি প্রভাবক কাজ করবে, যাকে কোনো অনুশীলন শিবির বা কৌশলগত পরিকল্পনা দিয়ে পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আর সেই প্রভাবকটি হলো আবহাওয়া।
আমেরিকার বেশ কয়েকটি ভেন্যুতে জুন এবং জুলাই মাসে তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। সেই সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ এত বেশি থাকে যে, ৯০ মিনিটের একটি ম্যাচ শেষ পর্যন্ত কেবলই টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়। এখন কেবল এই প্রশ্ন করাই যথেষ্ট নয় যে খেলোয়াড়েরা কীভাবে এই আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেবেন। বরং আসল প্রশ্ন হলো তীব্র গরম খেলোয়াড়দের জয়-পরাজয় এবং কারও আগে বাড়ি ফেরার টিকিট হাতে ধরিয়ে দেবে কি না। ইতিহাস অবশ্য এ বিষয়ে খুব স্পষ্ট উত্তর দেয়।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে যেসব বিশ্বকাপ খেলা হয়েছে, সেগুলোর সিংহভাগেরই শিরোপা জিতেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো। এই পরিসংখ্যান কিন্তু কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এটি মূলত মানব শরীরের গঠনপ্রকৃতি, আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং গরমের মধ্যে মানিয়ে নিয়ে ফুটবল খেলার সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত একটি নিয়মিত চিত্র।
সবচেয়ে চরম আবহাওয়ার উদাহরণ হয়ে আছে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে গুয়াদালাহারা এবং মেক্সিকো সিটির তাপমাত্রা নিয়মিত ৩৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেত। ইউরোপীয় টেলিভিশন দর্শকদের সময়সূচির কথা মাথায় রেখে স্থানীয় সময় দুপুর বারোটাতেও ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছিল। বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের মানদণ্ডে এই সিদ্ধান্তকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলা চলে। সে বছর ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল গঠন করেছিল, তবে একই সঙ্গে তারা ওই প্রতিকূল আবহাওয়ায় পারফর্ম করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত দলও ছিল। তাদের ছন্দময় ও গতিশীল ফুটবল সাতটি ম্যাচের কোনোটিতেই ক্লান্তির ছাপ ফেলতে পারেনি।
অন্যদিকে ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ইতালি সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে এমন এক শারীরিক শক্তিক্ষয়কারী ম্যাচ খেলে এসেছিল, যা পরবর্তীতে শতাব্দীর সেরা ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ফাইনাল ম্যাচটি যখন শুরু হয়, তখন ইতালির খেলোয়াড়দের শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। ফলে ব্রাজিল ৪-১ ব্যবধানে সহজ জয় পায়। পেলে পরবর্তীতে বলেছিলেন, গরম তাদের দলের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ তারা সারা জীবন এই গরমের মধ্যেই ফুটবল খেলে বড় হয়েছেন।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপেও একই ধরনের গল্প দেখা গিয়েছিল। আর্জেন্টিনা সেবার শিরোপা জিতেছিল। তবে পুরো টুর্নামেন্টের মূল গল্পটি ছিল ইউরোপীয় দলগুলোর ক্রমশ ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়া। সে যুগের অন্যতম সেরা ইউরোপীয় দল ফ্রান্স সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয়। ওই ম্যাচে ফ্রান্সের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে দেখেই মনে হচ্ছিল যে তারা তাদের স্বাভাবিক ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম গতিতে দৌড়াচ্ছেন। পশ্চিম জার্মানির কোচিং স্টাফরা পরবর্তীতে ফাইনালে তাদের পরাজয়ের পেছনে মেক্সিকোর গ্রীষ্মে দীর্ঘ ছয় সপ্তাহ ধরে জমা হওয়া ক্লান্তিকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। মেক্সিকোর মাটিতে আয়োজিত কোনো বিশ্বকাপেই আজ পর্যন্ত কোনো ইউরোপীয় দল শিরোপা জিততে পারেনি।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ এই একই ধারাকে আরও শক্তিশালী করে। ডালাস, অরল্যান্ডো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের তাপমাত্রা নিয়মিত ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকত। খেলার ধরনেও এর স্পষ্ট প্রভাব পড়েছিল। সেবার প্রতি ম্যাচে গোলের গড় ছিল তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বনিম্ন। ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে এই পরিসংখ্যানের পেছনে টানা গরমের কারণে খেলোয়াড়দের শারীরিক ক্লান্তিকে দায়ী করেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ফাইনালে ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়। ইতালির প্রধান তারকা রবার্তো বাজ্জো অতিরিক্ত সময়ে মাঠে ক্লান্ত পায়ে কোনোমতে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার নেওয়া চূড়ান্ত পেনাল্টি শটটি গোলবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। টুর্নামেন্টের প্রতিটি ধাপেই ব্রাজিল গরম আবহাওয়াকে অন্য দলগুলোর চেয়ে অনেক ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছিল।
শীতল বা আরামদায়ক আবহাওয়ার সাথে তুলনা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। ফ্রান্স ১৯৯৮ সালে তাদের নিজেদের মাটিতে মৃদু গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রায় বিশ্বকাপ জিতে নেয়। ২০১০ সালে জার্মানি দক্ষিণ গোলার্ধের শীতকালে দক্ষিণ আফ্রিকায় শিরোপা পুনরুদ্ধার করে। স্পেনের বিশ্বকাপ জয় এমন আবহাওয়ায় হয়েছিল যা তাদের বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে খেলার শৈলীর সাথে পুরোপুরি মিলে গিয়েছিল।
এই চিত্র থেকে একটি ধারাবাহিকতা স্পষ্ট দেখা যায়, আবহাওয়া যখন অনুকূলে থাকে তখন ইউরোপীয় দলগুলো জয়লাভ করে এবং আবহাওয়া প্রতিকূল হলে তারা বেশ ভালোভাবেই হোঁচট খায়।
২০২৫ সালের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ আমেরিকার বিভিন্ন ভেন্যুতে তীব্র গ্রীষ্মের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের কেমন ধকল সহ্য করতে হবে তার একটি স্পষ্ট আগাম ধারণা দিয়েছে। বেশ কয়েকজন ম্যানেজার উল্লেখ করেছেন, অতিরিক্ত গরমের তুলনায় ম্যাচগুলোর মধ্যবর্তী সময় খেলোয়াড়দের চাঙ্গা হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। যেসব ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে খেলার কৌশল ব্যবহার করে, টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে তাদের খেলার তীব্রতা ততই কমতে দেখা গেছে।
বিপরীতে দক্ষিণ আমেরিকান এবং আফ্রিকান দলগুলো এই আবহাওয়ার সাথে খুব সহজেই মানিয়ে নিয়েছে। এই প্রতিযোগিতাটি ইতিহাসের সেই সত্যকেই আবার প্রমাণ করে যে, ইউরোপীয় জলবায়ুর জন্য তৈরি করা শারীরিক ফিটনেস মডেল আমেরিকার গ্রীষ্মকালের সাথে কোনোভাবেই খাপ খায় না।
এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ২০২৬ সালের ভেন্যুর তালিকায় রয়েছে ডালাস, মিয়ামি, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং কানসাস সিটির মতো শহরগুলো, যেখানে জুলাই মাসের তীব্র গরমের সাথে বাতাসে উচ্চ মাত্রার আর্দ্রতা যুক্ত হয়। গ্রীষ্মের মাসগুলোতে মিয়ামির আবহাওয়া ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের মতে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
ফিফা অবশ্য তীব্র গরমের ম্যাচগুলোর জন্য কুলিং ব্রেক বা পানি পানের বিরতি এবং প্রথমার্ধের বিরতির সময় বাড়ানোর ব্যবস্থা রেখেছে। তবে এগুলো কেবলই আংশিক সমাধান। এক মাস ধরে টানা সাতটি ম্যাচ খেলার যে সম্মিলিত শারীরিক ক্লান্তি, তা কোনো ওয়াটার ব্রেক দিয়ে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
ইংল্যান্ডের যে শারীরিক শক্তিনির্ভর ও প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার খেলার শৈলী, তা অক্টোবরের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের তুলনায় মিয়ামির গরমে অনেক দ্রুত ভেঙে পড়বে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বের মাধ্যমে এই আবহাওয়ায় অভ্যস্ত। আফ্রিকান দেশগুলোর খেলোয়াড়েরা উচ্চ তাপমাত্রার পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে প্রাকৃতিকভাবেই একটি বাড়তি সুবিধা পাবে, যা বিশ্বকাপ শুরুর আগের র্যাংকিংয়ে সাধারণত প্রতিফলিত হয় না।
ইতিহাস বারবার একই রায় দিয়ে আসছে। যখন প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ফুটবল খেলা হয়, তখন কেবল প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের চেয়ে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে চতুর তারা বেশি সময় টিকে থাকে। যেকোনো কৌশলগত নির্দেশনার চেয়ে গরমের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত বেশি মূল্যবান প্রমাণিত হয়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফয়সালা মাঠের ঘাসেই হবে, তবে সেই মাঠের ঘাস যে সত্যিই অনেক বেশি উত্তপ্ত থাকবে তা বলাই বাহুল্য।


