ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতে থাকায় বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্পগুলোর খরচ হু হু করে বাড়ছে। একদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বারবার সংশোধন করতে হচ্ছে প্রকল্পের বাজেট।
বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো ডলারের চড়া দামের অজুহাত দিয়ে খরচ বাড়ানোর যেসব প্রস্তাব পাঠাচ্ছে, তাতে পরিকল্পনা কমিশনের টেবিল রীতিমতো উপচে পড়ছে। এই প্রবণতায় দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের মোট খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি সরকারের ওপর চেপে বসছে বিদেশি ঋণের বিশাল বোঝা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সংকটের শুরু ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তখন দেশে ডলারের তীব্র সংকট দেখা দেয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় অর্থনীতিতে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা। সেই সময় প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৮৬ টাকার মতো। চার বছরের ব্যবধানে সেই ডলার এখন ১২০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, টাকার মান কমেছে ৪০ শতাংশেরও বেশি।
প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেশের মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০১৫ সালে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী এই প্রকল্পের জন্য ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয় সরকার। তখন ডলারের দর ছিল ৮০ টাকা, যার ফলে টাকার অঙ্কে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
এখন নতুন কোনো ঋণ না নিয়েও, শুধু ডলারের দাম ১২২ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে সেই ঋণের দায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, কেবল ডলারের দাম বাড়ার কারণেই সরকারকে বাড়তি ২৫ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকার ঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকল্প ব্যয় বাড়ার পেছনে শুধু ডলারের দামকে দায়ী করলে চলবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে নিজেদের অদক্ষতা ঢাকতেই অনেকে ডলারের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন কি না, নীতিপ্রণেতাদের তা খতিয়ে দেখা দরকার।
টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কাজের ঢিলেমি, গাফিলতি বা অন্য কোনো কারণে খরচ বাড়লে, সেটাকে ডলারের দাম বাড়ার অজুহাত দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা চলে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পগুলো যদি সময়মতো শেষ হতো, তবে টাকার মান কমলেও এত বড় ক্ষতি হতো না। এখানে সুশাসনের অভাব এবং দুর্বল প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টিও স্পষ্ট।
একই চিত্র দেখা গেছে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) একটি প্রকল্পে। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনুমোদিত এই প্রকল্পের শুরুতে বাজেট ছিল ২ হাজার ২৭২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ডেসকোর নিজস্ব তহবিলে এই কাজ হওয়ার কথা ছিল। এখন কাজের পরিধি বাড়ানোর কথা বলে এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত আরও দুই বছর বাড়িয়ে তা সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এক ধাক্কায় খরচ বেড়েছে প্রায় ৬৩৬ কোটি টাকা বা ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৫২৮ কোটি টাকাই বেড়েছে বিদেশি ঋণের অংশে।
প্রকল্প পরিচালকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে ডলারের দাম ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা ধরা হলেও এখন হিসাব করতে হচ্ছে ১২২ টাকার ওপরে। ফলে পুরো প্রকল্পই চরম আর্থিক চাপে পড়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার টাইমস’কে জানান, বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নে যে দীর্ঘসূত্রতা চলে, সেটাই ডলারের দাম বাড়ার ধাক্কাকে আরও মারাত্মক করে তুলছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রকল্প সময়মতো শুরুও হয় না, শেষও হয় না। অনেক প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রশাসনিক জটিলতা কাটাতেই বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। এমনকি অনুমোদনের পরেও সময়মতো টাকা ছাড় হয় না, যার পেছনে প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতার অভাব অনেকাংশে দায়ী।
সিপিডির খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোতে যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর ব্যবস্থা শুরু থেকেই থাকার কথা। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার দামের ওঠানামা সামলানোর মতো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শুরুতেই যুক্ত থাকে। তাই ডলারের দাম বাড়ার কারণে কিছুটা খরচ বাড়া স্বাভাবিক এবং তা প্রকল্পের নিজস্ব বাজেট থেকেই সামাল দেওয়া উচিত।
খরচ বাড়ার তালিকায় আছে আরও প্রকল্প
ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) টাকায় জামালপুরের মাদারগঞ্জে যে ১০০ মেগাওয়াটের সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প হচ্ছে, সেটিও ডলারের মারপ্যাঁচে পড়েছে। ২০২১ সালে অনুমোদনের সময় এর খরচ ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৫১১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এখন টাকার মান কমে যাওয়ায় খরচ আরও ১০৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৬১৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুরুতে ডলারের দাম ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা ধরা হলেও এখন ঋণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হিসাব করা হচ্ছে ১১০ টাকা ৫০ পয়সা করে, যা বিদেশি খরচের খাতকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
একইভাবে ‘বাংলাদেশে টেকসই বিদ্যুৎ খাতের শক্তিশালীকরণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে ঋণ সংক্রান্ত বাড়তি খরচ মেটাতে আরও ৩২ কোটি ৫২ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৮ লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট প্রিপেইড মিটার বসানোর প্রকল্পেও এর আঁচ লেগেছে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল, যখন ডলারের বাজার শান্ত ছিল। কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারায় প্রকল্পটি ডলারের দাম বাড়ার মুখে পড়ে এর খরচ বেড়ে যায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড উন্নয়ন প্রকল্পসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রকল্পে খরচ বাড়ার মূল কারণ হিসেবে শক্তিশালী ডলারকেই দায়ী করা হচ্ছে।


