প্রেশার কুকার: এক শহরের ভেতরে জমে থাকা নৈতিক ভাঙনের গল্প

প্রেশার কুকার: এক শহরের ভেতরে জমে থাকা নৈতিক ভাঙনের গল্প
রায়হান রাফি পরিচালিত ছবি প্রেশার কুকার।
Advertisement
Advertisement

এই ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রেশার কুকার’ চলচ্চিত্রটিকে আমার কাছে রায়হান রাফির ক্যারিয়ারের একটি সত্যিকার অর্থেই সাহসী এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ মনে হয়েছে। ঈদের সিনেমা মানেই সাধারণত আমরা এক উৎসবমুখর, বীরত্বগাথা ও বিনোদননির্ভর অভিজ্ঞতার প্রত্যাশা করি, যেখানে দর্শক কিছুক্ষণের জন্য রূঢ় বাস্তবতা থেকে মুক্তি খোঁজে।

গত কয়েক ঈদে রাফি সেই ‘এস্কেপিজম’ বা পলায়নপর বিনোদনের কাজটিই সফলভাবে করে এসেছেন। ‘তাণ্ডব’ নিয়ে আমি নিজেই লিখেছিলাম, কীভাবে তিনি দর্শককে এক ভিন্ন জগতের রোমাঞ্চে নিয়ে যান। কিন্তু ‘প্রেশার কুকার’ সেই চেনা পথ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই ছবি ঈদের আনন্দের আবহে এক গভীর অস্বস্তি ও বিষাদ ছড়িয়ে দেয়।

সামাজিকমাধ্যমে ছবিটির প্রতিক্রিয়া দেখেও বোঝা যাচ্ছে, এখানে উত্তেজনার চেয়ে এক চাপা ভার বেশি কাজ করছে। আর এই অস্বস্তিকর অনুভূতি তৈরি করতে পারাটাই সম্ভবত নির্মাতার সবচেয়ে বড় সাফল্য।

এই চলচ্চিত্রের আখ্যানকে কোনো সরল রেখায় সংজ্ঞায়িত করা প্রায় অসম্ভব। এটি নির্দিষ্ট কোনো একক নায়ক বা গল্পের কাঠামো নয়, বরং এটি একটি শহরের গল্প–যেখানে ঢাকা শহর স্রেফ প্রেক্ষাপট নয়, একটি জীবন্ত ও সক্রিয় চরিত্র। এই মহানগরের হৃদপিণ্ডে আমরা অনেকগুলো জীবনের টুকরো দেখি, যেগুলো একে অপরকে স্পর্শ করলেও কখনও পূর্ণতা পায় না। গল্পের কেন্দ্রে আছে রেশমা, যে পরিস্থিতির চাপে একসময় ‘পাখি’ হয়ে ওঠে। ম্যাসাজ পার্লারে কাজ করার সময়ও রেশমার ভেতরে এক ধরনের সংযম ও সীমা ছিল, সে বাঁচার জন্য লড়ছিল কিন্তু নিজেকে বিলিয়ে দেয়নি। কিন্তু নিয়তি তাকে এমন এক প্রান্তে ঠেলে দেয় যেখানে শরীরই হয়ে ওঠে তার টিকে থাকার একমাত্র মাধ্যম। রেশমা থেকে ‘পাখি’ হয়ে ওঠার এই রূপান্তরই ছবির মূল আবেগীয় আধার।

ছবিটি নির্দিষ্ট কোনো একক প্লট বা সংঘাতের দিকে এগোয় না। এটি মূলত একটি শহরের ভেতরে জমে থাকা প্রচণ্ড ‘চাপের’ গল্প–যেখানে একাধিক চরিত্র টিকে থাকার চেষ্টায় রত, কিন্তু সেই সংগ্রামের পথেই তারা নৈতিক, আবেগীয় ও সামাজিকভাবে ভেঙে পড়ছে। স্বামী পালিয়ে যাওয়া রেশমা যখন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে; এক যুবক যার প্রেম স্পষ্ট কিন্তু জগৎ অস্পষ্ট; এক স্বার্থপর পরিবার; এক সহিংস রাজনীতিবিদ কিংবা ন্যায়বিচারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এক পুলিশ। এই সবার গল্প মিলে তৈরি হয় শহরের এক জটিল প্রতিচ্ছবি।

এদিক থেকে ছবিটি নিজেকে একটি ‘হাইপারলিঙ্ক-ইন্সপায়ার্ড ন্যারেটিভ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তবে এটি ‘বাবেল’, ‘ক্র্যাশ’ কিংবা ‘আমোরেস পেরোস’-এর মতো চিরাচরিত কাঠামো অনুসরণ করে না, যেখানে একটি কেন্দ্রীয় ঘটনা সব বিচ্ছিন্ন গল্পকে একবিন্দুতে মেলায়। ‘প্রেশার কুকার’-এর সংযোগগুলো ছড়ানো, অসম্পূর্ণ এবং অনেক সময় কেবল অনুভূতিগত। চরিত্রগুলো একে অপরের জীবনে ঢুকে পড়লেও কখনোই সম্পূর্ণভাবে এক হয় না। ফলে ছবিটি কাঠামোগত সন্তুষ্টির চেয়েও একটি অস্থির ও গুমোট নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

চরিত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ছবিটি বিশেষ করে পুরুষ চরিত্রগুলোর নির্মাণে একটি স্পষ্ট ও সচেতন অবস্থান নিয়েছে। চঞ্চল চৌধুরীর প্রতারক ও দায়িত্বহীন স্বামী, ফজলুর রহমান বাবুর নির্মম পুলিশ অফিসার, মিশা সওদাগরের সহিংস রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শহীদুজ্জামান সেলিমের কর্তৃত্বপরায়ণ পিতা কিংবা আজিজুল হাকিমের লালসাগ্রস্ত চরিত্র–সবাই মিলে একটি নৈতিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত সমাজের প্রতিচ্ছবি আঁকে। এরা স্রেফ আলাদা ব্যক্তি নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন। তবে এই নির্মাণে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্নও জাগে–সব পুরুষ চরিত্রই প্রায় একই ধরনের ‘ডার্ক’ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাদের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই; কেউ বেশি লোভী তো কেউ বেশি হিংস্র, কিন্তু দিনশেষে সবাই সহমর্মিতাহীন। ফলে একসময় দর্শক হিসেবে চরিত্রগুলোকে আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার এটিকে একটি সচেতন ‘টোনাল ডিসিশন’ হিসেবেও দেখা যায়, যেখানে নির্মাতা একটি ক্লান্ত ও চাপে পিষ্ট সমাজের সামগ্রিক ছবি দেখাতে চেয়েছেন।

এই অন্ধকার বাস্তবতার বিপরীতে নারী চরিত্রগুলো ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও তারা একই বৈরী পরিবেশে বন্দি। রেশমা চরিত্রটি বিস্তারিত হলেও অন্য নারী চরিত্রগুলো–যেমন ম্যাসাজ পার্লারের ম্যানেজার শেউতি কিংবা রেশমাকে ‘ট্রান্সফরমেশন’-এর দিকে ঠেলে দেওয়া নাইমা ইসলাম মাহা ততটা বিকশিত হয়নি। ইনফ্লুয়েন্সার মেয়েটির সাবপ্লট কিংবা শহীদুজ্জামান সেলিমের মেয়ের অবদমিত প্রেম সবই আছে, কিন্তু তাদের ভেতরের দ্বন্দ্বগুলো পুরোপুরি খোলেনি। এমনকি ননদ-ভাবির ডাইনামিক কিংবা নির্যাতিতা স্ত্রীর মুখ বুজে মেনে নেওয়ার দৃশ্যগুলো অনেকটা চিরাচরিত নাটুকে ঢঙের। তবে শবনম বুবলীর চরিত্রটি ক্ষমতা ও সহিংসতার জটিল সমীকরণে আটকে থাকা এক নারীর অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরে ছবির বাস্তবতায় আরেকটি স্তর যোগ করেছে।

পুরো ছবিটি পর্যবেক্ষণ করলে একটি অভিন্ন নৈতিক বলয় চোখে পড়ে। চরিত্রগুলোর পেশা, উপার্জনের পথ কিংবা সম্পর্ক–সবই এক বিষণ্ণ অন্ধকারে আচ্ছন্ন। এই সম-জাতীয়তা একদিকে যেমন একটি সুনির্দিষ্ট আবহ তৈরি করে, অন্যদিকে তা গল্পে ‘আবেগীয় বৈচিত্র্য’ বা কনট্রাস্টের অভাব ঘটায়। সবাই যখন একইভাবে ভেঙে পড়ে, তখন দর্শকের পক্ষে আলাদাভাবে কারও প্রতি সহমর্মিতা অনুভব করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তখন সংঘাতের চেয়ে ঘটনাক্রমই বড় হয়ে ওঠে। রাফি হয়তো ইচ্ছা করেই এমন এক শহর দেখাতে চেয়েছেন, যেখানে নৈতিকতার সব স্তর ধসে পড়েছে এবং কেউ কাউকে বাঁচায় না।

ছবির বিভিন্ন অধ্যায়ের নামকরণ–পরাণ, সুড়ঙ্গ, তুফান, তাণ্ডব–নির্মাতার নিজের পূর্ববর্তী কাজের প্রতি এক ধরনের ‘ট্রিবিউট’ বা আত্ম-রেফারেন্স। নির্মাণের দিক থেকে ছবিটি একাধিক ড্রাফট ও দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল মনে হলেও এর ভেতরে এক ধরনের ‘ইম্প্রোভাইজড’ শক্তি আছে, যা ছবিটিকে একদিকে অসম্পূর্ণ, অন্যদিকে জীবন্ত করে তোলে। অ্যানামরফিক লেন্সের ব্যবহার ছবিটিকে সিনেম্যাটিক বিস্তার দিয়েছে। জোয়াহের মুসাভভির ক্যামেরায় চরিত্রগুলোকে নানা প্রপ্স ও সেটের ভেতর দিয়ে দেখার প্রচেষ্টাটি ক্লোস্টোফোবিক শহরের চাপকে সার্থকভাবে দৃশ্যায়িত করেছে।

সংগীতের ক্ষেত্রে জাহিদ নীরবের আবহসঙ্গীত ও অঙ্কন কুমারের ‘বড়াই করে’ গানটি ছবির আবহের সঙ্গে মিশে এক গভীর আবেগ তৈরি করে। রুসলান রেহমান প্রতিটি চরিত্রের জন্য আলাদা ‘সাউন্ডস্কেপ’ তৈরি করে তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে অ্যাকশন দৃশ্যে র‍্যাপ সংগীতের ব্যবহার কখনো কখনো সহিংসতাকে এক ধরনের স্টাইলাইজড গ্লোরিফিকেশনের দিকে নিয়ে যায়, যা সব দৃশ্যে মানানসই মনে হয়নি। তবুও রুসলান রেহমান যে আমাদের চলচ্চিত্রে একটি শক্তিশালী আবহসঙ্গীতের ভাষা তৈরি করছেন, তা আশাব্যঞ্জক।

পারফরম্যান্সের জায়গায় এটি একটি শক্তিশালী ‘এনসেম্বল কাজ’। রিজভী রিজুর সংযত ও অন্তর্মুখী অভিনয় তাকে অন্য পুরুষ চরিত্রগুলোর থেকে আলাদা করেছে। ফজলুর রহমান বাবু তার স্বাভাবিকতার ভেতরেই এক হাড়হিম করা নির্মমতা ফুটিয়ে তুলেছেন। আজিজুল হাকিম ও মিশা সওদাগর তাদের চরিত্রের জটিলতা ও শক্তি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। শহীদুজ্জামান সেলিমের নীরবতা অনেক সময় সংলাপের চেয়েও বেশি কথা বলেছে। সবশেষে নাজিফা তুষি এই ছবির আবেগীয় কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। রেশমা থেকে ‘পাখি’ হয়ে ওঠার যে রূপান্তর এবং অল্প বয়সে একজন মায়ের আবেগীয় ভার বহন করা–তা তিনি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় ধারণ করেছেন।

ছবির প্রধান সীমাবদ্ধতা সম্ভবত এর অতি-বিস্তার। অসংখ্য চরিত্র ও সাবপ্লটের কারণে চিত্রনাট্য মাঝে মাঝে কিছুটা শিথিল মনে হয়। যদি এটি আরও সংক্ষিপ্ত ও কেন্দ্রীভূত হতো, তবে এটি একটি আরও শক্তিশালী হাইপারলিঙ্ক চলচ্চিত্র হতে পারত। তবুও ‘প্রেশার কুকার’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা। কারণ, এটি নিখুঁত হতে চায় না, বরং খুঁজতে চায়। একজন নির্মাতা তার পরিচিত ভাষা ছেড়ে নতুন ভাষা খুঁজছেন। এই নিরন্তর খোঁজই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই ছবিতে রাফি কোথাও সফল, কোথাও বিভ্রান্ত, কোথাও বা অতিরিক্ত। কিন্তু এই সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এক অরিজিনাল অভিজ্ঞতা। এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি একটি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া–যাকে হয়তো পুরোপুরি ‘বোঝা’ যায় না, কিন্তু ‘অনুভব’ করা যায়।

লেখকঃ আবু শাহেদ ইমন

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad