বইয়ের রাজধানী বলতে দেড় দশক আগেও চোখ বন্ধ করে সবাই বুঝতেন পুরান ঢাকার বাংলাবাজার। নতুন বইয়ের প্রকাশনা, মুদ্রণ, বাঁধাই, বিপণন কিংবা পাইকারি বিক্রি সবকিছুরই মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই এলাকা। দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে নামীদামি ও নবীন প্রকাশক, পরিবেশক, বই ব্যবসায়ী এবং লেখকদের নিয়মিত পদচারণায় মুখর থাকত এলাকাটি। নতুন বইয়ের সুবাস, ছাপাখানার দিনরাত ব্যস্ততা আর প্রকাশকদের কার্যালয়ে লেখকদের আড্ডায় কাটত সময়।
তবে সময়ের আবর্তে সেই চেনা দৃশ্যপটে এসেছে বড় পরিবর্তন। রাজধানীর ভৌগোলিক বিস্তার, প্রযুক্তির উৎকর্ষ, অনলাইন ও ই-কমার্সের জয়জয়কার এবং প্রকাশনা শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ বাংলাবাজারের সেই একক আধিপত্যে ফাটল ধরিয়েছে।
অবশ্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাবাজারের গুরুত্ব এখনও ফুরিয়ে যায়নি, তবে এটি আর আগের মতো একমাত্র কেন্দ্রও নয়। বইয়ের ব্যবসা এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর অলিতে-গলিতে, এমনকি ঢাকার বাইরেও।
সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য
দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই এখানে বইয়ের ব্যবসার ভিত গড়তে শুরু করে, যা স্বাধীনতার পর পূর্ণতা পায়। ধীরে ধীরে এটি রূপ নেয় দেশের বৃহত্তম প্রকাশনা ও পাইকারি বইয়ের বাজারে।
বই প্রকাশের প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হতো এই এলাকাকে ঘিরেই। লেখকরা পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের দপ্তরে হাজির হতেন, সম্পাদকদের কাঁচি-কলম চলত, আর ছাপাখানাগুলো থেকে বই বাঁধাই হয়ে সোজা চলে যেত দূর-দূরান্তে।
নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে কিংবা বইমেলাকে সামনে রেখে দেশের জেলা শহরের ব্যবসায়ীদের একমাত্র গন্তব্য ছিল বাংলাবাজার। পুরো সরবরাহব্যবস্থা সচল থাকত এই এক এলাকাকে কেন্দ্র করেই।
পাইকারি বই ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০১০ সাল পর্যন্ত দেশের প্রায় সব জেলার বই ব্যবসায়ীরা বাংলাবাজারে আসতেন। পাঠ্যবই, ধর্মীয় বই সবকিছুর মূল উৎস ছিল এই বাজার। তখন এমন কোনো মৌসুম ছিল না, যখন বাংলাবাজার ফাঁকা দেখা যেত।‘
কেন বদলাল দৃশ্যপট?
প্রকাশনা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাবাজারের এই রূপান্তরের পেছনে কোনো একক কারণ নেই। নগরায়ণ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির বিকাশ সবকিছু মিলেমিশে কাজ করেছে।
গত দুই দশকে ঢাকা শহর বড় হয়েছে। পুরান ঢাকা থেকে ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু সরে গেছে রাজধানীর উত্তর ও পশ্চিমাংশে। প্রকাশনা শিল্পও তার চেনা বৃত্ত ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন নতুন এলাকায়।
বর্তমানে শাহবাগ, আজিজ সুপার মার্কেট, বাংলামোটর, ধানমন্ডি, কাঁটাবন, গ্রিন রোড, মিরপুর ও উত্তরার মতো অভিজাত এলাকায় গড়ে উঠেছে নামী সব প্রকাশনা সংস্থার প্রধান কার্যালয়। যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা, করপোরেট পরিবেশ এবং দক্ষ কর্মী নিয়োগের সুবিধার কারণেই প্রকাশকেরা পুরান ঢাকা ছাড়ছেন।
প্রযুক্তির ছোঁয়া ও অনলাইন বাজার
বইয়ের বাজারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রধান অনুঘটক প্রযুক্তি। এখন আর বই কিনতে পাঠককে সশরীরে দোকানে যেতে হয় না। সামাজিক মাধ্যম বা অনলাইন বুকস্টোর ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের কারণে বই কেনাবেচা এখন হাতের মুঠোয়।
প্রকাশনা খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, এই ডিজিটাল বিপ্লব বই ব্যবসাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যার ফলে বাংলাবাজারে সশরীরে ক্রেতাদের ভিড় অনেকটাই কমেছে।
ডিজিটাল বই বা ই-বুকের বাজারও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন মোবাইল, ট্যাব বা ই-রিডারে বই পড়াকেই সহজ মনে করছে।
বই বিক্রেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বিক্রির ধরন বদলেছে। আমরাও এখন অনলাইনে বই বিক্রি করছি।’
বাংলাবাজারের ব্যবসায়ীদের মতে, এই বাজারের পিছু হটার অন্যতম প্রধান কারণ পুরান ঢাকার যানজট। দিনের বেশিরভাগ সময়ই এলাকাটি স্থবির হয়ে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় হয়, পার্কিংয়ের তীব্র সংকট রয়েছেই।
ভোগান্তি এড়াতে অনেক পাইকারি ক্রেতা ও পরিবেশক রাজধানীর অন্য প্রান্তে থাকা প্রকাশনা সংস্থাগুলো থেকে সরাসরি বই সংগ্রহ করা শুরু করেছেন।
ব্যবসায়ী মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রাক ঢুকতে পারে না, মাল ওঠানামা করতে অনেক সময় লাগে।’
বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলার বিকাশকেও বাংলাবাজারের পতনের আরেক কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাইকারি বই ব্যবসায়ী মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘আগে নতুন বই মানেই বাংলাবাজারে আসতে হতো। এখন প্রকাশকেরা বইমেলাকেই সবচেয়ে বড় বিক্রির জায়গা হিসেবে দেখেন। বছরের একটা বড় সময় ব্যবসার কেন্দ্র বইমেলায় চলে যায়।’
ফুরিয়ে যায়নি এখনো
সব পরিবর্তনের পরও বাংলাবাজারের গুরুত্বকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। বহু পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা, আধুনিক মুদ্রণ ও বাঁধাই কারখানা এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বাংলাবাজারের অলিগলিতেই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন লাখ লাখ বই এখান থেকেই ট্রাকে ট্রাকে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
বই ব্যবসায়ী মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘পাঠ্যবই, গাইড বই ও ধর্মীয় বইয়ের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার এখনো বাংলাবাজার।’
মাওলা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হকও মনে করেন, বাংলাবাজারের গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন প্রকাশনী গড়ে ওঠায় বাজারের পরিধি ও প্রতিযোগিতা দুটোই বেড়েছে, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ।
আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনির মতে, বাংলাবাজারের ঐতিহ্য ও ভিত এখনো অটুট। সময়ের প্রয়োজনে প্রকাশকেরা অনলাইন বিক্রির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন বলেই এই শিল্প এখনও টিকে আছে এবং সগৌরবে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলামের পরামর্শ, ‘বাজারকে টিকিয়ে রাখতে হলে ডিজিটাল অর্ডার ব্যবস্থা, আধুনিক গুদাম, সহজ পরিবহন ও পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।’


