মঞ্চজুড়ে রুনা, হৃদয়জুড়ে গান

মঞ্চজুড়ে রুনা, হৃদয়জুড়ে গান
রুনা লায়লা। ছবি: জান্নাতুল ফেরদৌস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

এ দেশ ষড়ঋতুর দেশ, আর যার কণ্ঠে ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য পাওয়া যায় তিনি রুনা লায়লা। উপস্থাপনায় থাকা অভিনেতা আফজাল হোসেন এভাবেই মঞ্চে এ কিংবদন্তী শিল্পীকে মঞ্চে ডাকলেন গান গাইবার জন্য। ৬২ বছরের ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী মঞ্চে তার একক সংগীতসন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হলো শুক্রবার সন্ধ্যায়।

লাল রঙের বেনারশি পরে সুরের রাণী এলেন মঞ্চে। দর্শক সারিতে থাকা সবাই করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানালেন। প্রতিউত্তরে রুনা সবাইকে সালাম জানালেন। শুরুতে শ্রদ্ধা জানালেন দেশের সকল মুক্তিযোদ্ধা, ভাষা শহীদদের। গাওয়া শুরু করলেন ‘দেশের জন্য যারা দিয়ে গেছো প্রাণ’।

অনেকে ভেবেছিলেন তিনি হয়তো লাইভ গাইবেন না। হয়তো লিপসিং করবেন। কিন্তু শিল্পী নিজেই জানালেন, আমি লাইভ গাইতেই পছন্দ করি। অত্যন্ত দরদ ও আবেগ দিয়ে তিনি গাইলেন প্রতিটি গান। প্রতি শ্রোতা হৃদয় ছুঁয়ে গেছে তার কণ্ঠ।

রুনা লায়লা পুরো সংগীত জীবনে গান গেয়েছেন ১০ হাজারেরে উপরে। তার কণ্ঠে উঠেছে ১৮টি ভাষার গান। অভিনয় করেছেন তাকে নিয়ে বানানো ‘শিল্পী’-তে। চলচ্চিত্রটির ‘শিল্পী’ গানটি যখন গাইলেন তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলালেন দর্শকরা।

বয়স ৭৪ হলেও পুরোটা সময় তিনি দাঁড়িয়েই গাইলেন। অবশ্য মাঝে দু-একবার আফজাল হোসেন অনুরোধ করে বসিয়েছেন, বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। গান গাওয়ার সময় কিছুটা ঘেমেও যাচ্ছিলেন। সেটি খেয়াল করেছিলেন আফজাল হোসেন।

শুধু আফজাল হোসেনের সঙ্গেই নয়, রুনা লায়লা দর্শকদের সঙ্গে নানান মজায় মেতেছিলেন পুরো আয়োজন জুড়ে।
শুধু আফজাল হোসেনের সঙ্গেই নয়, রুনা লায়লা দর্শকদের সঙ্গে নানান মজায় মেতেছিলেন পুরো আয়োজন জুড়ে। ছবি: জান্নাতুল ফেরদৌস/টাইমস

‘শিল্পী’ গানটি গাইবার সময় কোমর দুলিয়ে কিছুটা নাচলেনও তিনি। গানের সময় আফজাল হোসেনকে ডাকলেন নাচার জন্য। কিন্তু নাচলেন না। যদিও গান শেষে স্বভাবসুলভ রসিকতা করে রুনা লায়লা বললেন, আমি চাইলে কিন্তু নাচাতে পারি। জবাবে আফজাল হোসেন জানালেন, তিনি একবার মঞ্চ নাটকের জন্য নাচ শিখেছিলেন। নাচ বললে ভুল হবে, নাচের একটি মুদ্রা। এর বাইরে তিনি নাচের কিছুই পারেন না।

শুধু গানই গাননি রুনা। করলেন স্মৃতিচারণ। উঠে এলো তার বড় বোন দিনা লায়লার গল্প। যাকে গান শেখাতে আসতো ওস্তাদ। আর রুনার জন্য নাচের ওস্তাদ। কিন্তু বড় বোনের গানের রেওয়াজ শুনে শুনে তিনি প্রথম গাইতে শিখলেন। ১৯৭৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর দিনা লায়লা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করলেও সে বোনের স্মৃতিতে কিছুটা আবেগী হলেন রুনা লায়লা।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান- উপমহাদেশের তিন দেশেই সমান তালে গেয়েছেন রুনা, পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক খুশবন্ত শিং একবার বলেছিলেন, ‘তোমরা রুনা লায়লাকে দিয়ে দাও, আমরা তোমাদেরকে ফারাক্কার পানি দিয়ে দিবো’। আফজাল হোসেন যখন এ স্মৃতি স্মরণ করলেন, তখন রুনা বললেন, ‘আমি কিন্তু যাইনি। আমি এখানেই থেকে গেছি, এখানেই থাকবো।’

আরও পড়ুন

স্মরণ করলেন জীবনের প্রথম ছবিতে প্লেব্যাকের স্মৃতি। জানালেন, তখন তিনি ছিলেন পাকিস্তানের করাচীতে। সেখানে ‘স্বরলিপি’ ছবির পরিচালক নজরুল ইসলাম ও সংগীত পরিচালক সুবল দাস তার বাসায় গেলেন। রুনার ভাষ্যে, তারা আমাকে বললেন— আপনি সিনেমায় গাইবেন কিনা? বাংলা গান। আমি বললাম, গাইবো। কেনো গাইবো না।

মনযোগ দিয়ে গানের কথা দেখছেন রুনা লায়লা
মনযোগ দিয়ে গানের কথা দেখছেন রুনা লায়লা। ছবি: জান্নাতুল ফেরদৌস

এরপর তিনি মঞ্চে পরিবেশন করলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা বিখ্যাত গান ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’। দর্শক সারিতে বসে থাকে প্রবীণরা ফিরে গেলেন রাজ্জাক, ববিতার সাদাকালো স্মৃতিতে।

উপস্থাপক আফজাল হোসেন তার স্মৃতিতে বললেন, ৪০ বছর আগে বিটিভি থেকে রিহার্সেল শেষে বের হওয়ার সময় রুনা লায়লাকে দেখে অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তিনি জানালেন, রুনা কখনও নিজেকে খুব সহজলভ্য করেননি। আর তাই তার নামের পাশে শুধু তারকা লেখা যায় না, লিখতে হয় মহাতারকা।

দেশ সেরা যন্ত্রশিল্পীরা বাজিয়েছেন রুনা লায়লার গানে।
দেশ সেরা যন্ত্রশিল্পীরা বাজিয়েছেন রুনা লায়লার গানে। ছবি: জান্নাতুল ফেরদৌস/টাইমস

একে একে মঞ্চে পরিবেশন করলেন ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁতে দাও না একটা পলাশ ফুলের মালা’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’, ‘সাধের লাউ’। মঞ্চে কখনো তিনি নজরুল গান গাননি। তবে এবার তিনি গাইলেন ‘ভুলিতে পারি না’। পরিবেশনা শেষ করলেন তার বিখ্যাত গান ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ দিয়ে।

‘সাধের লাউ’ পরিবেশনের সময় দর্শক সারিতে বসে থাকা শিশু থেকে প্রবীণ অধিকাংশ দর্শকই নাচলেন। আর যখন ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ শেষ করলেন তখন সবাই দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট ধরে তাকে অভিবাদন জানলেন করতালি দিয়ে।

‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’ শিরোনামের এই আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক কনসার্ট। অনুষ্ঠানে রুনা লায়লাকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়। সম্মাননা তুলে দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ।

রুনা লায়লার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দিচ্ছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী
রুনা লায়লার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দিচ্ছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী। ছবি: জান্নাতুল ফেরদৌস/টাইমস

প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘আপনার কণ্ঠে প্রতিটি গান সময়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। আপনার শিল্পসাধনা বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মর্যাদা উজ্জ্বল করেছে।’

আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, ‘দেশের বরেণ্য শিল্পীদের যথাযথ সম্মান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটি সেই প্রচেষ্টারই অংশ।’

আয়োজকেরা জানান, অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ বন্যার্ত মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হবে। এর আগে একই ধরনের একক আয়োজন করা হয়েছিল কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন ও সৈয়দ আব্দুল হাদীকে নিয়ে।

পুরো আয়োজনটিতে ১১ জন যন্ত্রশিল্পী তার সঙ্গে বাজিয়েছেন। এদের মধ্যে ছিলেন দেশের ছিলেন দেশের অন্যতম ব্যান্ডতারকা ফোয়াদ নাসের বাবু ও সংগীত পরিচালক মাকসুদ জামিল মিন্টু। সকল পরিবেশনা যখন শেষ হয়, তখন তিনি যন্ত্রসংগীতশিল্পী, তার সঙ্গে কোরাস গাওয়া শিল্পীসহ সকল দর্শকদের ধন্যবাদ দিলেন। দুঃখ করে বলেন, হয়তো আর দেখা হবে না।

রুনা লায়লার মত শিল্পী শতবর্ষে একবারই জন্মায়। ৭৪ বছরের জীবনের ৬২ বছরই কাটিয়ে দিয়েছেন গান নিয়ে। তার জীবনে অপূর্ণতা কী? জানালেন, কোনো অপূর্ণতা নেই। তিনি আমৃত্যু গান পরিবেশন করতে চান। আমরাও চাই শতায়ু হন তিনি। আমাদেরকে মুগ্ধ করুক গানে গানে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad