সাত দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সংগীতশিল্পী, গিটারবাদক ও শব্দ প্রকৌশলী রাশিদ শরীফ শোয়েব। ডেঙ্গু, উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন তিনি। কবে বাসায় ফিরতে পারবেন, সেটাও জানেন না।
এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অসুস্থতার কথা জানাতে গিয়ে বাংলাদেশের বিনোদন জগতের দীর্ঘদিনের এক সংকটের কথাও সামনে এনেছেন তিনি। কাজ শেষ করেও বছরের পর বছর পারিশ্রমিক না পাওয়ার সেই অভিযোগ এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

শোয়েব জানিয়েছেন, ২০১১ সাল থেকে ঢাকার নিকেতন এলাকায় সংগীত ও শব্দ নিয়ে পেশাগতভাবে কাজ করছেন তিনি। টেলিভিশন ও অনলাইন বিজ্ঞাপনচিত্র, ধারাবাহিক, চলচ্চিত্রসহ নানা ধরনের নির্মাণে কাজ করেছেন। নিয়মিত কাজ করতে করতে কাজের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বিভিন্ন জায়গায় জমতে শুরু করেছে তার বকেয়া পারিশ্রমিক।
তার দাবি, ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের যে টাকা এখনো বাকি রয়েছে, তার পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার কম নয়। অর্থাৎ প্রায় ১৪ বছর ধরে জমেছে এই পাওনা।
অথচ নিজের সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়ে সেই অর্থ তার হাতে নেই। শোয়েব জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে নিজের কাজের জায়গা উন্নত করতে এবং এখন হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ চালাতে তাকে মায়ের জমানো টাকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এমনকি মায়ের সঞ্চয়পত্রও ভাঙতে হয়েছে।
নিজের লেখায় শোয়েব প্রশ্ন তুলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কাজ করার পর একজন পেশাজীবীকে কেন এমন অবস্থায় পড়তে হবে। তার ভাষায়, এই পরিস্থিতিই দেখিয়ে দেয় বিনোদনজগত তার প্রতিভাবান মানুষদের কী ধরনের বাস্তবতার মধ্যে রাখছে।
এখনই অবশ্য কারও নাম প্রকাশ করেননি তিনি। যাদের কাছে তার টাকা বাকি রয়েছে, তাদের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময় দিয়েছেন হিসাব মেলানোর জন্য। পুরোনো নথি বের করে পাওনার হিসাব ঠিক করে অক্টোবরের শুরুতে তার কাছে এসে অর্থ পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তা না হলে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্টদের পরিচয় প্রকাশ করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তবে শোয়েব এখনো কার কাছে কত টাকা পান, কোন কাজের জন্য কত টাকা বাকি কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেননি। ফলে তার উল্লেখ করা প্রায় ৫০ লাখ টাকার বকেয়ার হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এই অঙ্কটি আপাতত তার নিজের দাবি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
শোয়েবের পেশাগত পরিচিতি অবশ্য দীর্ঘদিনের। তিনি সংগীতদল মেঘদলের সদস্য। মেঘদলে কণ্ঠ, সুর ও গিটার নিয়ে কাজ করেন তিনি। চলচ্চিত্রের সংগীত ও আবহ সংগীতেও তার দীর্ঘ কাজ রয়েছে। বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’র আবহ সংগীত করেছেন তিনি। ‘স্বপ্নজাল’-এর সংগীতের সঙ্গেও ছিলেন শোয়েব। সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র ‘রইদ’-এর সংগীতের কাজেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
কিন্তু তার অসুস্থতা ও বকেয়া পারিশ্রমিকের কথা সামনে আসার পর আলোচনা আর শুধু শোয়েবকে ঘিরে থাকেনি। তার লেখার নিচে এবং পরে নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনোদনজগতের অনেকেই দীর্ঘদিনের একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেছেন।
অভিনেত্রী দিলরুবা হোসেন দোয়েল শোয়েবের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে মন্তব্য করেছেন, এভাবে চলতে পারে না। অনেকে তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। আবার কেউ কেউ লিখেছেন, কাজের টাকা আদায়ের জন্য শিল্পী ও কলাকুশলীদের এভাবে দিনের পর দিন ঘুরতে হওয়াটাই এই অঙ্গনের বড় ব্যর্থতা।
চলচ্চিত্র সম্পাদক ও নির্মাতা ইকবাল আহসানুল কবীর জুয়েল প্রশ্ন তুলেছেন, একজন সৃজনশীল মানুষকে ১৪ বছর ধরে কাজের জায়গা চালানোর পর কেন নিজের পাওনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন লেখা লিখতে হবে। শুধু লেখাটিতে প্রতিক্রিয়া জানানোর বদলে নিজেদের আচরণ নিয়েও ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নির্মাতা জাহিদ প্রীতম বিষয়টিকে আরও বড় পরিসরে সামনে এনেছেন। একজন অভিনেতা কেন চিকিৎসার সময় অসহায় হবেন, একজন পরিচালক কেন অর্থকষ্টে পথ হারাবেন, একজন সংগীতশিল্পীকে কেন নিজের পাওনা আদায়ের জন্য প্রকাশ্যে লিখতে হবে, কিংবা একজন সম্পাদককে কেন পরিবারের চিকিৎসার জন্য অন্যের সাহায্য চাইতে হবে, এমন একের পর এক প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তার মতে, পারিশ্রমিক বকেয়া রাখার সমস্যা বাংলাদেশের বিনোদনজগতে বহুদিনের। পরিচালক ও লেখকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, কলাকুশলীদের পাওনা এবং কাজ শেষ হওয়ার অনেক পরে অর্থ পরিশোধের প্রচলিত ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
সিনেমাটোগ্রাফার তাহসিন রহমানও একই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নিকেতনকেন্দ্রিক প্রযোজনা ব্যবস্থার প্রতি দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্যের মূল কথা, একজন চলচ্চিত্রকর্মীর সময় ও শ্রম চলচ্চিত্র তৈরিতে ব্যয় হওয়ার কথা, নিজের কাজের টাকা আদায়ের জন্য মানুষের পেছনে ঘুরে বেড়াতে নয়।
আরও অনেক মন্তব্যে একই ধরনের ক্ষোভ দেখা গেছে। নিকেতনে নির্মাণ-পরবর্তী কারিগরি কাজে যুক্ত একজন কর্মী লিখেছেন, অল্প অঙ্কের পাওনার জন্যও অনেককে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। তার অভিযোগ, কখনো কাজের শুরুতে কিছু টাকা পাওয়া গেলেও বাকি অর্থ পেতে দীর্ঘ সময় ঘুরতে হয়। একসময় এই অভিজ্ঞতায় হতাশ হয়ে অনেকে পেশা থেকে সরে যেতেও বাধ্য হন।

শোয়েবের লেখার বিপুল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, বিষয়টি তার একার অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। বরং নিজের বকেয়া অর্থের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন শিল্পী, নির্মাতা ও কারিগরি কর্মীদের একটি অংশ।
সমস্যাটি নতুনও নয়। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের বেশ কয়েকজন শিল্পী ও কলাকুশলীর একই ধরনের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছিল। সেখানে কেউ জানিয়েছিলেন, কাজ শেষ করার পর বছরের পর বছর পারিশ্রমিকের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। কেউ বারবার যোগাযোগ করেও টাকা পাননি। আবার অনেকে ভবিষ্যতে কাজ হারানোর আশঙ্কায় প্রকাশ্যে পাওনার কথা বলতেও ভয় পান।
পরের বছরগুলোতেও সেই চিত্র বদলায়নি। ২০২৪ সালে একজন অভিনয়শিল্পী অভিযোগ করেন, কাজ শুরুর দুই বছর পরও তিনি তার পারিশ্রমিক পাননি।
২০২৫ সালে প্রবীণ অভিনেত্রী ডলি জহুর জানান, চলচ্চিত্রে কাজ করতে গিয়ে তার ৩৪ লাখ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক বকেয়া হয়েছিল। সবচেয়ে কঠিন সময় আসে তার স্বামীর ক্যানসার ধরা পড়ার পর। তখন চিকিৎসার জন্য অর্থ প্রয়োজন হলেও নিজের পাওনা টাকা চেয়েও তিনি পাননি বলে জানান।
একই সময়ে অভিনেতা, পরিচালক ও সম্পাদকসহ আরও অনেকের বকেয়া পারিশ্রমিকের অভিজ্ঞতা সামনে আসে। কেউ কেউ জানান, প্রয়োজনের সময় বারবার নিজের পাওনা চেয়েও অর্থ পাননি। আবার কেউ বলেছেন, এই সমস্যা এতটাই পুরোনো যে এখন অনেকে তা নিয়ে প্রকাশ্যে কথাও বলতে চান না।

ফলে রাশিদ শরীফ শোয়েবের বর্তমান ঘটনা একটি বড় প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে। একটি কাজ শেষ হওয়ার পর একজন সংগীতশিল্পী, পরিচালক, লেখক, সম্পাদক, চিত্রগ্রাহক, শব্দ প্রকৌশলী বা অন্য কোনো কর্মীকে তার নিজের পারিশ্রমিকের জন্য কেন মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে?
শিল্পী বা কলাকুশলীর আয় তো কোনো অনুদান নয়। সেটি তার কাজের বিনিময়ে পাওনা অর্থ। সেই অর্থ যদি প্রয়োজনের সময় হাতে না আসে, তাহলে পেশাগত সাফল্যের আড়ালেও একজন মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারেন, শোয়েবের বর্তমান অবস্থা সেই প্রশ্নটিই সামনে আনছে।
দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা একজন সংগীতশিল্পী এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অথচ চিকিৎসার জন্য তাকে নিজের উপার্জিত অর্থের বদলে মায়ের সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে বলে তার দাবি। এই জায়গাটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে তার সহকর্মীদের।
শোয়েব কবে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তার দাবি করা প্রায় ৫০ লাখ টাকার কতটা এবং কবে তিনি ফিরে পাবেন, সেটিও জানা নেই। তবে তার লেখার পর যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। নিকেতনের বকেয়া পারিশ্রমিকের সংকট শুধু একজন রাশিদ শরীফ শোয়েবের গল্প নয়। তার ঘটনা বহুদিন ধরে জমে থাকা শিল্পী ও কলাকুশলীদের ক্ষোভকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।


