দুই দশকের স্বপ্ন, ২৬ দিনে নির্মাণ রুবাইয়াতের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’

দুই দশকের স্বপ্ন, ২৬ দিনে নির্মাণ রুবাইয়াতের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’
চলচ্চিত্র পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন এক মাইলফলক যোগ হতে যাচ্ছে। নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড নির্বাচিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসরের অরিজোন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগে। আগামী সেপ্টেম্বরে ইতালির ভেনিসে হবে ছবিটির বিশ্ব প্রিমিয়ার। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনে জায়গা করে নিচ্ছে।

যে গল্পের বীজ নির্মাতা মনে রোপিত হয়েছিল শৈশবে দুই দশক আগে। রুবাইয়াত বলেন, ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড একটি সুপারন্যাচারাল চলচ্চিত্র। গল্পটি আবর্তিত হয়েছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মেফেয়ার বিউটি পার্লারকে ঘিরে। বহু বছর ধরে প্রচলিত একটি আরবান মিথ থেকে ছবিটির অনুপ্রেরণা এসেছে—কথিত আছে, এক সময় সেখানে একজন কনে রহস্যজনকভাবে মারা গিয়েছিলেন। আমাদের ছবিতে আরেকজন কনে সেই পার্লারে সাজতে এসে একের পর এক অদ্ভুত ও অতিপ্রাকৃত ঘটনার মুখোমুখি হয়। রহস্য, মনস্তত্ত্ব এবং সুপারন্যাচারাল উপাদানের মধ্য দিয়ে গল্পটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।’

‘আমি যখন ছয়-সাত বছরের শিশু, তখন মা আমাকে নিয়ে নিয়মিত মেফেয়ার বিউটি পার্লারে চুল কাটাতে যেতেন। সেখানেই প্রথম এই গল্পটি শুনি। এটি ঢাকার বহু নারীর কাছে পরিচিত একটি আরবান মিথ, বিশেষ করে আমাদের প্রজন্মের অনেকেই এই গল্পটি শুনে বড় হয়েছেন।’

রুবাইয়াত আরও বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে পারি, এটি শুধু একটি ভূতের গল্প নয়; এটি নারী, সৌন্দর্য, বিয়ে এবং সামাজিক প্রত্যাশাকে ঘিরে আমাদের সংস্কৃতির কথাও বলে। সেই ভাবনা থেকেই বহু বছর ধরে লিখতে লিখতে এ ছবির জন্ম।’
চিত্রনাট্য নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করলেও শুটিং হয়েছে অনেক কম সময়ে। রুবাইয়াতের ভাষায়, ‘এই ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে আমি প্রায় বিশ বছর কাজ করেছি। কিন্তু শুটিং হয়েছে মাত্র ২৬ দিনে। দীর্ঘ প্রস্তুতি, অসংখ্য খসড়া, সূক্ষ্ম পরিকল্পনা এবং অসাধারণ একটি আন্তর্জাতিক নির্মাণদলের কারণে এত অল্প সময়ে ছবিটি নির্মাণ সম্ভব হয়েছে।’

বাংলাদেশ, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে ও পর্তুগালের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটির পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ হয়েছে প্যারিস ও লিসবনে। ইউরোপের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র তহবিলের সহায়তা পেয়েছে এটি। নির্মাণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজ করেছেন বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও প্রযুক্তিবিদরা।

আরও পড়ুন

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড-এর পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন ও চলচ্চিত্রের দৃশ্য
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর একটি দৃশ্য

রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্রে নারীরা শুধু চরিত্র হিসেবে নয়, নির্মাণ প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রাখেন। দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড সেই ধারাকেই আরও বিস্তৃত করেছে বলে জানালেন তিনি। ‘এই ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বহু নারী শিল্পী ও প্রযুক্তিবিদ কাজ করেছেন। অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে সিনেমাটোগ্রাফি, সম্পাদনা, শব্দ নির্দেশনা, প্রযোজনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন সৃজনশীল বিভাগে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এই সহযোগিতামূলক পরিবেশ ছবিটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।’

ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নবাগত জাইনীন করিম। পাশাপাশি রয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, সুনেরাহ বিনতে কামাল এবং রিকিতা নন্দিনী শিমু।

জাইনীনকে নিয়ে রুবাইয়াত বলেন, ‘এটি তার প্রথম চলচ্চিত্র, কিন্তু তিনি অবিশ্বাস্য রকমের নিষ্ঠা, সাহস এবং সংবেদনশীলতা নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে এই চরিত্রের কাছে সমর্পণ করেছিলেন। শুটিংয়ের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি নিজের সমস্ত মনোযোগ, শ্রম এবং আবেগ এই চলচ্চিত্রের জন্য দিয়েছেন। আমি তার অভিনয় নিয়ে ভীষণ গর্বিত।’

আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা হলেও ছবিটির শিকড় যে বাংলাদেশের, তা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন রুবাইয়াত। ‘আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফলে আমরা বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও কারিগরি দক্ষতাকে একত্র করতে পেরেছি। কিন্তু গল্প, ভাষা, চরিত্র, সংস্কৃতি এবং আবেগ—সবকিছুই গভীরভাবে বাংলাদেশের।’

তিনি বিশ্বাস করেন, দর্শকের কাছে এটি শুধু একটি রহস্যের চলচ্চিত্র হয়ে থাকবে না। ‘এটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা শুধু দেখার সময় নয়, শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে থেকে যাবে—তাদের ভাবাবে, প্রশ্ন করবে এবং হয়তো নিজেদের কিছু ভয় ও স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড় করাবে।’

রুবাইয়াত হোসেনের চলচ্চিত্রজীবনের শুরু মেহেরজান দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মুক্তির সময় বিতর্কের মুখে পড়লে তৎকালীন সরকার তা নিষিদ্ধ করে। এরপর আন্ডার কনস্ট্রাকশন-এ তিনি নগর মধ্যবিত্ত নারীর আত্মপরিচয়ের সংকটকে তুলে ধরেন। মেড ইন বাংলাদেশ পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের সংগ্রাম দেখান, সেটিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রশংসিত হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad