ই-কমার্সের আড়ালে এক বিস্তৃত পঞ্জি ও এমএলএম নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রমিজ মার্ট। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে অন্তত ৫২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই টাকা দিয়ে চীন থেকে পণ্য আমদানি করে ব্যবসায়ের কথা বললেও জানা গেছে, প্রকৃত পণ্য বিক্রি হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার। বাকি অর্থের হদিস না মেলায় নগদহাট-পরবর্তী এই নতুন প্ল্যাটফর্ম ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে এসেছে মাসুদ আলমের নাম, যিনি আগে বিতর্কিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নগদহাটের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বর্তমানে প্রমিজ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নগদহাটের মাধ্যমে এর আগে ১০০ কোটি টাকার বেশি সংগ্রহের পর সেটি বন্ধ করে প্রমিজ মার্ট চালু করা হয়েছে।
ই-লার্নিং এন্ড আর্নিং লিমিটেডের মাধ্যমে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ২৯৭ কোটি টাকার একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্পের কেলেঙ্কারির জন্যও মাসুদ আলম বিতর্কিত। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন সহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে এবং ব্যাংক হিসাব জব্দ রাখা সহ দেশ ত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রমিজ মার্ট গ্রাহকদের সামনে অস্বাভাবিক লাভের প্রস্তাব তুলে ধরে দ্রুত অর্থ সংগ্রহ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রমিজ মার্টে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে ৩৬ মাসে ৯ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কাগজে-কলমে এই অর্থ পরিশোধের উৎস হিসেবে চীন থেকে পণ্য আমদানি ও বিক্রির কথা বলা হলেও অনুসন্ধানে এমন কোনো বাস্তব বাণিজ্য কার্যক্রমের প্রমাণ মেলেনি। বরং নতুন গ্রাহকের টাকা দিয়ে পুরোনো গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। প্রমিজ মার্টের এই কার্যক্রম পঞ্জি স্কিমের ক্লাসিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়।
এদিকে প্রমিজ মার্টে অর্থ প্রবাহ ধরে রাখতে রেফারেল বোনাসভিত্তিক একটি পিরামিড কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ যে যত নতুন গ্রাহক যুক্ত করতে পেরেছেন, তার জন্য তত বেশি কমিশন, র্যাঙ্ক ও বোনাস নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে পণ্য বিক্রির পরিবর্তে নতুন সদস্য সংগ্রহই হয়ে উঠেছে এই প্রতিষ্ঠানটির আয়ের প্রধান উৎস, যা এমএলএম ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কাঠামো টেকসই নয় এবং নতুন অর্থ প্রবাহ বন্ধ হলেই পুরো ব্যবস্থাটি ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এতে শুরুর দিকের গ্রাহকরা অর্থ ফেরত পেলেও শেষে যুক্ত হওয়া বিশাল সংখ্যক গ্রাহকরা তাদের অর্থ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
পঞ্জি স্কিম হলো এমন একটি প্রতারণামূলক বিনিয়োগ পদ্ধতি, যেখানে প্রকৃত ব্যবসার মুনাফা নয় বরং নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে আগের বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন পরিশোধ করা হয়।
এদিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নগদহাটের অতীত অভিজ্ঞতা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০১৯ সালের দিকে নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেড অবিশ্বাস্য ডিসকাউন্ট ও ক্যাশব্যাকের প্রলোভন দেখিয়ে ব্যাপক অগ্রিম সংগ্রহ করেছিল। পরে দেখা যায়, নতুন গ্রাহকের টাকা দিয়ে সীমিত কিছু পণ্য সরবরাহ করে বাজারে আস্থার আবহ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সংগ্রহের অঙ্ক কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছালে হঠাৎ করেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং বহু গ্রাহক অর্থ ফেরত না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
এর ধারাবাহিকতায় অভিযোগ উঠেছে, নগদহাটের ডাটাবেজ ব্যবহার করে বহু গ্রাহককে প্রমিজ মার্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের একটি অংশ দাবি করেছেন, নগদহাটে আটকে থাকা টাকা ফেরত পেতে হলে প্রমিজ মার্টে নতুন করে বিনিয়োগ করতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে “বিনিয়োগ সমন্বয়” নামে দ্বিতীয় দফা অর্থ সংগ্রহের কৌশল হিসেবে দেখছেন, যা প্রতারণার ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে প্রমিজ গ্রুপের সিস্টার কনসার্ন হিসেবে পরিচিত ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে ২৯৭ কোটি টাকার কাজ এই প্রতিষ্ঠান পায়। তবে টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষক নিয়োগ, ভাতা প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে একাধিক অসঙ্গতির কথা তদন্ত সংস্থাগুলোর নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভুত উপায়ে অর্থ উপার্জন ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে তদন্ত চলছে বলে টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন দুদকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা।
এদিকে সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমএলএম কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা বেআইনি। পাশাপাশি উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে আমানত সংগ্রহ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনারও পরিপন্থী এবং পরিস্থিতি ভেদে এটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায়ও আসতে পারে। অস্তিত্বহীন পণ্য বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভোক্তা অধিকার আইনেও দায় তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহ শিবলী নোমান টাইমসকে বলেন, ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এর ধারা ৩.১.৩-এ স্পষ্ট বলা আছে, ডিজিটাল কমার্সের মাধ্যমে এমএলএম বা নেটওয়ার্ক ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না। একই নির্দেশিকার ধারা ৩.১.১০ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো ধরনের অর্থ ব্যবসাও পরিচালনা করা নিষিদ্ধ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, শুরু থেকেই জাঁকজমকপূর্ণ সেমিনার, নৌ-বিহার, প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং বিনিয়োগ উপস্থাপনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করা হয়েছে। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কৌশলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। এভাবে গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। উদ্যোক্তারা নিজেরাই গ্রাহকদের কাছে দাবি করেছেন, প্রমিস গ্রুপের মোট সম্পদ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। তবে এই দাবির বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি টাইমস।
এমএলএম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং স্কিম হলো এমন একটি ব্যবসা মডেল, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা প্রকৃত পণ্য বা সেবা বিক্রির চেয়ে মূলত নতুন সদস্য যুক্ত করার মাধ্যমে বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক থেকে আয় করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ই-কমার্স ব্যবসার কথা বলে গ্রাহকদের অফিসে ডেকে নেওয়া হয় এবং চীন থেকে আমদানি করা পণ্য পাইকারি দরে কিনে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিক্রি করতে না পারলে সেই দায়িত্ব প্রমিজ মার্টকে দেওয়ার বিকল্প দেখানো হয়, যেখানে ৩৬ মাস সময় নিয়ে বিক্রির কথা বলা হয় এবং শুরু থেকেই কিস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বিষয়টিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ কেটে রাখার কথাও বলা হয়।
প্রমিজ মার্টের গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ১০ লাখ টাকার পণ্য ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্টে ৫ লাখ টাকায় কিনছে এবং এই অর্থ তাদের ব্যক্তিগত একাউন্টের ড্যাশবোর্ডে দেখাচ্ছে। ৩ বছর পরে এই ৫ লাখ টাকা ১০ লাখ হয়ে যাবে এমন প্রতিশ্রুদি দেওয়া হচ্ছে এবং সার্ভিস চার্য হিসেবে ১ লাখ টাকা কেটে রেখে ৯ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন বছরে মূলধন দ্বিগুণ হওয়ার মতো কোন ব্যবসা বাংলাদেশে নেই। এটি স্পষ্টভাবে পঞ্জি স্কিম। মূলত নতুন গ্রাহকদের টাকা দিয়ে পুরনো গ্রাহকদের টাকা শোধ করা হচ্ছে। এভাবে নতুন গ্রাহকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা হচ্ছে। পূর্বের পঞ্জি স্কিমগুলোতেও এভাবেই গ্রাহকদের থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন অর্থ প্রবাহ থেমে গেলে পুরো কাঠামো হঠাৎ ধসে পড়তে পারে, যার অভিঘাতে আবারো কয়েক হাজার পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এর আগেও আমরা দেখেছি একের পর এক পঞ্জি স্কিমের কারণে কয়েক লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে প্রতারক চক্র বিদেশে পালিয়ে গেছেন।
এরপরও এ ধারনের স্কিম বন্ধ না হওয়াটি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এসব পঞ্জি স্কিম রুখতে জনসাধারণকে সতর্ক হতে হবে, লোভে পড়ে অর্থ দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে উদ্যোগী হয়ে এসব পঞ্জি স্কিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেন, ইভ্যালির ঘটনার পর প্রণীত নীতিমালায় উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে পণ্য ও সেবা বিক্রিও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রমিজ মার্টের কার্যক্রম নেটওয়ার্কিং ব্যবসা বলেই মনে হচ্ছে এবং এ ধরনের মডেল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিদ্যমান নীতিমালায় নিষিদ্ধ রয়েছে।
প্রমিজ মার্টের বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে মাসুদ আলম টাইমসকে বলেন, যারা ক্রয় করার সাথে সাথে পণ্য নিয়ে যেতে চান তারা নিতে পারেন। আর যারা নগদে পণ্য নিতে চান না তারা টিম তৈরি করে সেগুলো টিমের গ্রাহকদের কাছে হাতবদল করেন। এভাবে গ্রাহকদের উদ্যোগেই টিম তৈরি হচ্ছে ও ব্যবসা বিস্তৃত হচ্ছে বলে জানান তিনি।


