বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশের প্রায় চারশ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
পোশাক মালিকদের শীর্ষ এই সংগঠনটি জানিয়েছে, বর্তমানে আরও অনেক কারখানা আর্থিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে তারা আগামী বাজেটে বিশেষ নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যালয়ে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এই তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্প এখন দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শুল্কসংক্রান্ত চাপের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
‘চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে পোশাক রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট মাস থেকে রপ্তানি আদেশ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে কম কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন খরচও বহুগুণ বেড়ে গেছে।’
বিজিএমইএ জানিয়েছে, বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি খরচও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গ্যাসের দাম ২৮৬ শতাংশ আর গত পাঁচ বছরে বিদ্যুতের ৩৩ শতাংশ দাম বেড়েছে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। ২০২৪ সালে ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার বাড়িয়ে করা হয় ৯ শতাংশ। এ ছাড়া, চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি এবং ২০২৩ সালের জুলাই থেকে রপ্তানি প্রণোদনা প্রায় ৬০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া এই খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
শিল্পের সক্ষমতা ফিরে পেতে বিজিএমইএ বেশ কিছু প্রস্তাবনা পেশ করেছে। তারা নগদ প্রণোদনার ওপর ১০ শতাংশ উৎস কর মওকুফ এবং পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য রপ্তানির ওপর উৎস কর এক শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া, রপ্তানি আয়ের ওপর উৎস কর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা এবং রপ্তানি ভর্তুকির ওপর অগ্রিম আয়কর বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটি সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনে শুল্ক সুবিধার আবেদন জানিয়েছে।
একই সভায় টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘প্রণোদনার ওপর কর আরোপ করা এর মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।’
‘তুলা থেকে সুতা এবং কাপড় থেকে তৈরি পোশাক পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একাধিক স্তরে কর দেওয়ার ফলে প্রকৃত করের বোঝা ১২ থেকে ১৪ শতাংশে দাঁড়ায়। এটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকাকে কঠিন করে তুলছে।’
তিনি জানান, বিশ্বের ৭০ শতাংশ পোশাক এখন কৃত্রিম তন্তুর দখলে থাকলেও বাংলাদেশে এই খাতের উপস্থিতি খুবই সীমিত। তাই নতুন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় নমনীয়তা আনার আহ্বান জানান তিনি।
সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার জটিলতার কথা উল্লেখ করে বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘বিভিন্ন যন্ত্রাংশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন এইচএস কোড থাকায় আমদানিতে অপ্রয়োজনীয় বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের এসব প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, ‘করপোরেট রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থা ডিজিটালাইজড করা এবং কর ব্যবস্থাকে সহজ করার কাজ চলছে। একটি স্বচ্ছ ও সহজ কর ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং সরকারের করের পরিধিও বৃদ্ধি করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’


