সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি, প্রত্যাখ্যান বিরোধী দলের

সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি, প্রত্যাখ্যান বিরোধী দলের
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৭ সদস্যের এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত ৫টি সদস্য পদ শুন্য রাখা হয়েছে।

সোমবার রাতে ব্যারিষ্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। কমিটির সভাপতি সালাউদ্দিন আহমদ (কক্সবাজার-১)। সদস্যরা হলেন, মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম (বরগুনা-২), মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, (ঝিনাইদহ-১), জয়নাল আবেদিন (বরিশাল-৩), মোহাম্মদ জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬), হাবিবুর রহমান (ভোলা-১), মোহাম্মদ নুরুল হক (পটুয়াখালী-৩), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (চট্টগ্রাম-৫), ফারজানা শারমিন (নাটোর-১), সাকিলা ফারজানা (মহিলা আসন-১) মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল (শেরপুর-৩), মোহাম্মদ অলিউল্লাহ (বরগুনা-১)।

তবে, জনরায়কে উপেক্ষা করে এই বিশেষ কমিটি গঠনের অভিযোগ এনে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল। পরে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যের কড়া জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

প্রস্তাবিত কমিটি উত্থাপনের পর ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচনের পূর্বে সব দলই  গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানিয়েছিল এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হবে। এরই প্রেক্ষিতে তারা দুটি শপথ নিয়েছেন, একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। বিরোধী দল মনে করে তাদের দুটি শপথই বহাল ও কার্যকর আছে। সুতরাং, সেই সংস্কার পরিষদকে বাইপাস বা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যদি এই সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, তবে তারা এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছেন।

শফিকুর রহমান ঘোষণা দেন, জনগণের রায়কে সম্মান না জানানোর প্রতিবাদে তারা শুধু এই কমিটিতে অংশগ্রহণ থেকেই বিরত থাকবেন না, বরং সংসদ থেকে ওয়াকআউট করবেন।

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া জবাব

আরও পড়ুন

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের অনুমতি নিয়ে এর কড়া জবাব দেন। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা যে পয়েন্টে ওয়াকআউট করছেন তা তাদের বিবেচনায় সঠিক হতে পারে, তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের মূল প্রত্যাশা হলো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা। এই লেজিসলেচারে যদি পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা না হয়, তবে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলেও দেশকে ওই বিতর্কিত সংশোধনীর ওপর ভিত্তি করেই চলতে হবে। সুতরাং, সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা এবং সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া এই জাতিকে নতুন প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

বিরোধীদলীয় নেতার দুটি শপথের দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুটি শপথ নিলে প্রথম শপথটিই তো অবৈধ হয়ে যায়। কারণ বর্তমান সংবিধান অনুসারেই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন এবং সেই সংবিধান অনুযায়ীই সংসদে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সরকারি ও বিরোধী উভয় দল আলোচনা করেছে। সাংবিধানিক নিয়ম ও ধারাবাহিকতা অনুসারেই সংসদের প্রত্যেকটি অধিবেশন ও বৈঠক পরিচালিত হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, ‘সংবিধানে কোথায় আছে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেওয়া যাবে? তিনি একে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তে আইনি উপদেষ্টার নথিতে পাস করে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল যা প্রথম দিন থেকেই অবৈধ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮ এবং তৃতীয় তফসিল লঙ্ঘন করে ব্লু পেপারে সংসদ সদস্যদের জন্য আরেকটি শপথের যে ফর্ম ছাপানো হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ বা বাতিল এবং এর কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।’

গণভোট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গণভোটের যে আদেশ, যেটিকে ‘জুলাই আদেশ’ বা ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ নাম দেওয়া হয়েছে, সেটি প্রথম দিন থেকেই এখতিয়ার বহির্ভূত, ফ্রড অন কনস্টিটিউশন এবং কালারেবল লেজিসলেশন ছিল, যা রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। রাজনৈতিক সমঝোতার জুলাই সনদের কোথাও এমন কিছু ছিল না যেখানে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করেছে।’

তিনি আরও বলেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫ অনুযায়ী একক ও স্বাধীন রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের পূর্ণ এখতিয়ার ও সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণকে অনুচ্ছেদ ৭ অনুসারে সংসদ সদস্যদের দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন যে, জুলাই জাতীয় সনদে যে সমঝোতা হয়েছে তার চার ভাগের সাড়ে তিন ভাগ তারা মানেন, কিন্তু বাকি আধা খানি অংশ সংবিধানের ওপর অবৈধ হাত বাড়িয়েছে। বিরোধী দলকে সংসদে এসে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যথায় রাস্তায় গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কমিটি করলে সংবিধান সংশোধন না করে তারা বসে থাকতে পারবেন না। আর সংবিধান সংশোধন না করলে জাতিকে শেখ হাসিনার দেওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই চলতে হবে, যা কেউ চায় না।’

অবিলম্বে এই সংবিধান সংশোধনী কমিটি কাজ শুরু করবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, জুডিশিয়ারি, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংসদ ও সংসদের বাইরে বিস্তারিত আলোচনা ও বৈঠক করবেন। এরপর সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, বিরোধীদলীয় সদস্যরা ইমোশনাল বা আবেগসর্বস্ব রাজনীতি পরিহার করে একটি শক্তিশালী সংবিধান সংশোধনী বিল আনার স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
টাইমস রিপোর্ট
টাইমস রিপোর্ট

Staff Reporter, Times of Bangladesh

সম্পর্কিত খবর