ধর্মের ভিত্তিতে কোনো ভেদাভেদ না করে সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মানবিকতার ভিত্তিতে সবাই মিলে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই।
সোমবার বরিশালের গৌরনদীতে ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা যে যেই ধর্মের হই, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য হচ্ছে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করত। বর্তমান হোক বা ভবিষ্যতে, আমরা চাই সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে মিলে, কোনো ভেদাভেদ না করে মানবিকতার দিক বিচার করে এই দেশকে পুনর্গঠন করতে। আমরা এই দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই।’
বর্তমান সরকারের লক্ষ্য দেশের সব মানুষ যেন ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। সবার আগে যেমন বাংলাদেশ বলি, একইভাবে করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার জন্যও বাংলাদেশ আমরা বলি।’
তিনি বলেন, সবাই ধৈর্য ধরে একসঙ্গে চললে দেশকে প্রত্যাশিত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বর্তমান সরকারের রাজনীতি, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের মানুষ যেন আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপির রাজনীতির উৎস জনগণ। জনগণের সমর্থন যতক্ষণ বিএনপির সঙ্গে থাকবে, ততক্ষণ দল কোনো বাধা মানবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। দেশকে এগিয়ে নিতে দলমত, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবার সমর্থন চান তারেক।
এক বছরে ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড
বাটাজোর অশ্বিনী কুমার ইনস্টিটিউট মাঠে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে সারা দেশের ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।
তারেক বলেন, দেশে প্রায় ৪ কোটি পরিবার রয়েছে। ধাপে ধাপে এসব পরিবারের নারীপ্রধানের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তিনি বলেন, ‘আজ গৌরনদীতে ৬০০ পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। আরও পরিবার বাকি আছে। ধাপে ধাপে আমরা তাদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের পর তারা আগের সরকারের তৈরি বাজেট পেয়েছিলেন। সেই বাজেটে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেটে এ কর্মসূচির জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক বলেন, আগামী এক বছরের বাজেটের ভিত্তিতে সারা দেশে ৪১ লাখ পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। সে হিসাবে প্রতিটি উপজেলায় গড়ে ৭ হাজার পরিবার এ কার্ড পাবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সব পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নারীদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা চালু করা হবে। ভালো ফল করা মেয়েদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করার কথাও জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘শিক্ষার পাশাপাশি নারীরা, মায়েরা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেই জন্যই আমরা এই ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছি।’
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের ঘোষণা
এর আগে, গৌরনদীতে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ রোপণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, পরিবেশ রক্ষা এবং দেশকে আরও সবুজ করতে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।
কর্মসূচির স্লোগান, ‘বৃক্ষ রোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’
তারেক রহমান বলেন, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় গাছের সংখ্যা কম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলেছে এবং আগের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাপকভাবে গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হবে না। প্রতিটি গাছের যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘নিজেদের দেশকে নিজেরাই ঠিক করতে হবে। বাইরের কেউ এসে ঠিক করে দিয়ে যাবে না।’
একদিনের সফরে সোমবার সকালে সড়কপথে বরিশালের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। তাকে স্বাগত জানাতে গৌরনদীর ভুরঘাটা থেকে উজিরপুর সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় অবস্থান নেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে গৌরনদীর বাটাজোরে পৌঁছান তারেক। সেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন প্রজাতির চারটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনায় দোয়া হয়।
সকাল ১০টা ৫৪ মিনিটে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য শেষ করে বাটাজোর থেকে বরিশালের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী।
সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ মহড়া পরিদর্শন
বরিশাল যাওয়ার পথে বাবুগঞ্জ উপজেলার পূর্ব রহমতপুর এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চলমান গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ মহড়া পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মহড়াস্থলে পৌঁছে সেনাসদস্যদের যুদ্ধপ্রস্তুতি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন কৌশলগত প্রশিক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। সেনা কর্মকর্তারা মহড়ার উদ্দেশ্য, প্রশিক্ষণের ধাপ ও বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পর্কে তাকে জানান।
মহড়ায় শত্রুপক্ষের ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিরোধে ব্যবহৃত অ্যান্টি ড্রোন মাল্টি ব্যারেল সিস্টেমের কার্যকারিতা প্রধানমন্ত্রীর সামনে প্রদর্শন করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ প্রযুক্তির ব্যবহার ও সক্ষমতা সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন।
পরে জঙ্গলের ভেতরে দায়িত্ব পালনরত সেনাসদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাদের প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব পালন ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে খোঁজ নেন তিনি।
একপর্যায়ে সেনাসদস্যদের সঙ্গে মাটিতে বসে কথা বলেন তারেক রহমান। মাঠপর্যায়ে প্রস্তুত করা খাবারও খান তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌটার ভেতরে মোমের আগুনে রান্না করা সাদা ভাত, ডাল, আলুভর্তা, চিংড়ি মাছ ও ডিমের তরকারি তাকে পরিবেশন করা হয়।
সেনাসদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতীয় সংকট, দুর্যোগ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব জনগণের আস্থা আরও শক্ত করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিকসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
‘নিজেদের পরিবেশ নিজেদের রক্ষা করতে হবে’
বেলা সোয়া ২টায় বরিশাল নগরের ত্রিশ গোডাউনসংলগ্ন সাগরদী খালের দুই পাশে একযোগে ৩৫০টি গাছের চারা রোপণ কর্মসূচিতে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।
সেখানে তারেক রহমান বলেন, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ মিলে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। মাত্র কয়েক দিন আগে সব শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণের মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিদায় করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবাই যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের জন্য, মানুষের জন্য ভালো কাজগুলো করি, তাহলে সবাই উপকৃত হব। আসুন, এই বৃক্ষরোপণের দিনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই, যে যার অবস্থান থেকে পরিবেশকে সুন্দর ও ভালো রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
তিনি বলেন, ‘নিজেদের পরিবেশ নিজেদের রক্ষা করতে হবে। নিজেদের ঘর যদি নিজেরা গুছিয়ে না রাখি, তাহলে ঘরটা ময়লা হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে আমরা যদি এলাকা, পাড়া ও দেশ পরিষ্কার না রাখি, পরিবেশের দিকে খেয়াল না রাখি, তাহলে ভুক্তভোগী আমরাই হব।’
গাছের চারা রোপণ করলে দায়িত্ব শেষ হবে না উল্লেখ করে স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গাছগুলোর পরিচর্যা করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সাগরদী খাল পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশনের নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের খালে পলিথিন ও বোতল না ফেলার এবং অন্যদেরও এসব ফেলতে বারণ করার আহ্বান জানান তারেক রহমান। বর্জ্য নির্ধারিত বিনে ফেলতে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালাতে সিটি করপোরেশনকে বলেন তিনি।
এ সময় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, বরিশাল ৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল ৬ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন এবং বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তারেক রহমানের প্রথম বরিশাল সফর।
শিক্ষার্থীদের আবদারে গাড়ি থামিয়ে সেলফি
গৌরনদীর কর্মসূচি শেষে বরিশাল যাওয়ার পথে স্কুলশিক্ষার্থীদের আবদারে গাড়িবহর থামান প্রধানমন্ত্রী। সোমবার দুপুরে ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের সাতমাইল এলাকায় বরিশাল ক্যাডেট কলেজ ক্যাম্পাসসংলগ্ন শিশুনিকেতন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা সড়কের পাশে অবস্থান করছিলেন। তাদের দেখে গাড়িবহর থামান তারেক রহমান। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি তাদের অনুরোধে নিজেই সেলফি তোলেন। পরে শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রীড়া সামগ্রী তুলে দেন তিনি।
শিশুনিকেতন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের বিদ্যালয়ের সামনে গাড়িবহর থামিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। তিনি তাদের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন এবং ক্রীড়া সামগ্রী উপহার দিয়েছেন। এটি আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত স্মরণীয় একটি মুহূর্ত।’
প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফর উপলক্ষে ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী থেকে সাগরদী আমতলা মোড় পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অবস্থান নেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনেও শিক্ষার্থীরা তাকে শুভেচ্ছা জানায়।
দুপুর দেড়টার দিকে বরিশাল নগরে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। সড়কের পাশে অবস্থানকারীদের হাতে বরিশালের উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি লেখা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড ছিল।
বিকালে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তারেক রহমান। সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় সভা শেষে সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি।


