রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে ৪৫ বছর পর মোজাফফর হোসেন নামে অবসরপ্রাপ্ত মেজরের গ্রেপ্তার নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তিনি একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জালে ধরা পড়েছিলেন বলে টাইমস অব বাংলাদেশ নিশ্চিত হয়েছে।
র্যাবের একজন সাবেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০০৭ সালে ১/১১ এর পর ঢাকার বিমানবন্দরে মোজাফফর তাদের হাতে আটক হয়েছিলেন। তবে তিনি তার সামরিক কর্মকর্তার পরিচয় গোপন করে তার কানাডীয় নাগরিক ও ব্যবসায়ীর পরিচয় সামনে আনেন।
এ বিষয়ে জানতে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখায় কল করা হলে প্রশ্ন শুনে নিজেকে মেজর মাহমুদ নামে পরিচয় দিয়ে একজন কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর তার মরদেহ পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে গোপনে সমাহিত করার প্রক্রিয়ায় মোজাফফরের অংশ নেওয়ার তথ্য আছে। পরে পুলিশের গুলিতে তিনি আহত হন। পিঠে গুলির ক্ষত নিয়েও তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
নানা ঘটনাপ্রবাহ শেষে কানাডায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পান মোজাফফর। পরে সে দেশের নাগরিকও হন। সেই পাসপোর্ট নিয়েই ৯০ দশক থেকে বাংলাদেশে যাতায়াত করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় সরকারের সঙ্গে ব্যবসাও করেছেন।
র্যবের সেই সাবেক কর্মকর্তা জানান, মোজাফফর তাদেরকে দেখায় তার পিঠে কোনো গুলির দাগ নেই। আর সে সময়ের সরকারও এ বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বার্তা সংস্থা প্রোবকে মোজাফফর ১৯৯৭ সালে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছিলেন তিনি ত্রিপুরা হয়ে ভারতে প্রবেশ করে কিছুদিন নানা জায়গায় অবস্থান করে থাইল্যান্ড যান। পরে কানাডায় স্থায়ী হন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মোজাফফর দেশে ফিরে আসেন এবং যমুনা সেতু নির্মাণে শ্রমিক সরবরাহের কাজ করেন। ওই খবর জানাজানি হলে, সে সময় ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা তার সিরাজগঞ্জের বাড়িতে হামলাও করে।
তখন বার্তা সংস্থাকে প্রোব দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোজাফফর জিয়াউর রহমানকে হত্যা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আদ্যোপান্ত এবং হত্যার পর রাঙ্গুনিয়ায় তাকে এবং আরও দুই সামরিক কর্মকর্তাকে সমহিত করার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ৩০ মে ভোরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাকে হত্যার পর কর্নেল মতিউর রহমান তাকে মরদেহ গভীর জঙ্গলে পাহাড়ের নিচে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি জিয়া ও তার তার দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তার মরদেহ জিপে করে রাঙ্গুনিয়ার একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যান।
সেখানে চিহ্ন হিসেবে তিনি দুটি খেজুর গাছ বেছে নেন। স্থানীয় ইমামকে খুঁজে এনে তাকে বলেন, পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশন্ত্র সংগঠন শান্তি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিন জন অফিসার শহীদ হয়েছেন। পরে সেখানেই তাদের জানাজা ও লাশ দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
তবে অভ্যুত্থানকারীদের মধ্যে বিভেদ এবং তাদের নেতা চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর পালিয়ে যাওয়ার পর বিদ্রোহ কার্যত দমন হয়ে যায়। মঞ্জুর পরে আত্মসমর্পণ করলে বন্দি অবস্থায় তাকে হত্যা করা হয়। সেনা আইনে বিদ্রোহের দায়ে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ জনকে নানা মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
সে সময় পালিয়ে যাওয়া দুজন সেনা কর্মকর্তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়, যাদের একজন মোজাফফর হোসেন, দ্বিতীয় জন হলেন মেজর এস এম খালেদ।
এরপর তিনি প্রথম কবে দেশে ফেরেন, সেটি স্পষ্ট নয়। তবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর শফিকুর নামে একজনের ‘মিস্টিক ইস ট্রেডিং করপোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যমুনা সেতুতে শ্রমিক সরবরাহের কাজ করেছিলেন মোজাফফর। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আর নেই।
২০০৭ সালে একবার অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও মোজাফফর সতর্ক হননি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ভূমিধস জয়ের পর তিনি নিয়মিতই বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের আগে মোজাফফরের দেশে ফেরার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে টাইমস। এরপর তিনি আর ফিরে যাননি। একটি সূত্র বলছে, তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, কেউ তাকে চেনে না, তাই তিনি নিরাপদ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির ১৬ জুলাইয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদ করে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে জানানো হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়।
ডিএমপি মোজাফফরকে জিয়াউর রহমান হত্যার ‘পলাতক আসামি’ ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তার বিরুদ্ধে এখন কোন অভিযোগে, কোন সামরিক বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তা জানানো হয়নি।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা জানান, যেহেতু তিনি সেনাবাহিনী থেকে পলাতক ছিলেন, তার বিচার সেনা আইনে হতে হবে।
মোজাফফরের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে পারেনি টাইমস।
তবে আগের দিন তিনি বলেন, ‘উনি (মোজাফফর) দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সামরিক আইনে তার বিচার হবে।’
শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কক্সবাজারে নিজের নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছেন, ‘তাকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাতে যে আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িতদের বিচার করা হয়েছিল, সে আইনে বিচার করা যায়। এটা সেনাবাহিনী দেখছে।’


