বেদনার ইতিহাস বয়ে চলা ডিআর কঙ্গো ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে

বেদনার ইতিহাস বয়ে চলা ডিআর কঙ্গো ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে
কঙ্গোর স্বাধীনতা সংগ্রামী প্যাট্রিস লুমুম্বার সমাধিসৌধ। ২০২২ সালের ৩০ জুন। ছবি: এএফপি/বাসস
Advertisement
Advertisement

বিশ্বকাপে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) প্রত্যাবর্তন অনেকের কাছে কেবল একটি সাধারণ ফুটবল সংবাদ হতে পারে। কিন্তু এই একটি নামের পেছনে লুকিয়ে আছে আফ্রিকার ইতিহাসের দীর্ঘ ও অস্থির এক অধ্যায়। ১৯৭৪ সালের পর দীর্ঘ ৫২ বছর অপেক্ষা শেষে বিশ্বমঞ্চে ফেরা এই দেশটি দেখেছে ঔপনিবেশিক শোষণ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গৃহযুদ্ধ, খনিজ সম্পদ দখলের লড়াই এবং অসংখ্য মানবিক বিপর্যয়। সেই দীর্ঘ ও রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে ২০২৬ সালে আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে তারা।

দেশটির বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ সালে, তখন এর নাম ছিল ‘জায়ার’। সেটি ছিল সাব-সাহারান আফ্রিকার কোনো দেশের প্রথম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ। তবে সেই অভিষেক ছিল চরম হতাশার। তিন ম্যাচের সবকটিতে হেরে প্রতিপক্ষের জালে একবারও বল পাঠাতে পারেনি তারা, উল্টো হজম করে ১৪টি গোল। এরপর কেটে যায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময়।

অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও আন্তঃকনফেডারেশন প্লে-অফ পেরিয়ে আবারও ইতিহাস গড়ে তারা। মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় অতিরিক্ত সময়ে জ্যামাইকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে দলটি। প্লে-অফসহ পুরো বাছাইপর্বে খেলা ১৩টি ম্যাচের মধ্যে দুটি ড্র এবং ছয়টি জয় আসে মাত্র এক বা দুই গোলের ব্যবধানে। পুরো অভিযানে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সুসংগঠিত রক্ষণভাগ।

বিশ্বকাপে ফিরেই পর্তুগালের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দেশের হয়ে প্রথম গোল করেন ইওয়ানে উইসা। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এই ফরোয়ার্ড ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডের হয়ে খেলেন। অভিষেক আসরেই দেশের প্রথম বিশ্বকাপ গোলদাতা হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন তিনি। ফিফা ও আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের রেকর্ড অনুযায়ী, এই জাতীয় ফুটবল দল ‘লেস লিওপার্ডস’ আফ্রিকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল।

কঙ্গোর ইওয়ান উইসা (ওপরে ডানে) বিশ্বকাপ ফুটবলের কে গ্রপের ম্যাচে পর্তুগাল ও কঙ্গোর মধ্যকার খেলায় তার দলের প্রথম গোলটি করেন। ১৭ জুন হিউস্টনে ছবি: এপি/ইউএনবি

বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসনামলে দেশটিতে সংগঠিত ফুটবলের ভিত্তি তৈরি হলেও ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পর খেলাটির দ্রুত বিকাশ ঘটে। ১৯৬৩ সালে দেশটি ফিফার পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। স্বাধীনতার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয় তারা। ১৯৬৮ সালে প্রথমবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জিতে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পর ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয়বারও শিরোপা জেতে। একই বছর তারা বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। এই সময়টিকে দেশটির ফুটবলের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে এরপর সেই ধারাবাহিকতা আর থাকেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং ক্রীড়া অবকাঠামোর দুর্বলতার প্রভাব জাতীয় দলেও পড়ে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে দলটি। অবশ্য ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে তারা।

১৯৯৮ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে তৃতীয় স্থান অর্জনের পর ২০০০ ও ২০০৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে তারা। ২০০৯ ও ২০১৬ সালে আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়। ২০১৫ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও তারা তৃতীয় স্থান অর্জন করে। দীর্ঘ উত্থান, পতন ও পুনরুত্থানের এই পথ পেরিয়ে ফের বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেছে আফ্রিকার এই দলটি।

স্বাস্থ্য সংকটের কারণে গণজমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বুনিয়ার বাসিন্দারা তাদের দলের প্রথম ম্যাচ দেখতে রাস্তাঘাট ও ছোট ছোট দোকানে ভিড় জমান। ছবি: এএফপি/বাসস

এই দেশ শুধু ফুটবলের জন্য পরিচিত নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ দেশ। অথচ দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, দুর্নীতি এবং সশস্ত্র সংঘাতের কারণে আজও বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। মধ্য আফ্রিকায় অবস্থিত এই রাষ্ট্র আয়তনের দিক থেকে আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ, যার আয়তন ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ৮৫৮ বর্গকিলোমিটার।

দেশটির উত্তরে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ সুদান, পূর্বে উগান্ডা, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি এবং তানজানিয়া, দক্ষিণে জাম্বিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমে অ্যাঙ্গোলা এবং পশ্চিমে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। আটলান্টিক মহাসাগরের একটি ছোট উপকূলও রয়েছে তাদের। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের মধ্য বর্ষের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১১ কোটি ৬৪ লাখ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জিডিপি প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ১৩৫ ডলারের কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৫ সালের ক্রয়ক্ষমতা সমন্বিত মাথাপিছু জিডিপির হিসাব অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সপ্তম দরিদ্রতম দেশ হিসেবে চিহ্নিত।

সংবিধান অনুযায়ী ডিআর কঙ্গো একটি একক, আধা-রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র। রাষ্ট্রপ্রধান প্রেসিডেন্ট সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন এবং সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। আইনসভা দুই কক্ষবিশিষ্ট–নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ সিনেট। দেশে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং ক্ষমতাসীন ‘ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড সোশ্যাল প্রপ্রেস’ (ইউডিপিএস) অন্যতম প্রধান দল।

তবে কাগজে-কলমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হলেও দীর্ঘদিনের গৃহ সংঘাত, সশস্ত্র বিদ্রোহ, দুর্নীতি এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার কারণে দেশটির শাসনব্যবস্থা এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। বর্তমান সংকটের শিকড় দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ইতিহাস ঔপনিবেশিক শোষণ, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনের মাধ্যমে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড কঙ্গোর ওপর নিজের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ‘মানবিক মিশন’ বা সভ্য করার অজুহাতে তিনি সেখানে ইতিহাসের অন্যতম বর্বর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

ডিআর কঙ্গোর কোলওয়েজির নিকটবর্তী একটি খনিতে আকরিকের বস্তা বহন করেন ক্ষুদ্র খনি শ্রমিকরা ২০২২ সালের ১২ অক্টোবর। ছবি: এএফপি/বাসস

ব্রিটিশ অভিযাত্রী হেনরি মরটন স্ট্যানলির সহায়তায় সেখানে স্টেশন স্থাপন করা হয়। স্ট্যানলি বলেছিলেন, ‘রেলপথ ছাড়া কঙ্গোর মূল্য এক পয়সাও নয়।’ আর এই রেলপথ নির্মাণ এবং রাবার ও হাতির দাঁতের বাণিজ্য থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা তুলতে স্থানীয় মানুষের ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন।

কঙ্গোলিজ পুরুষদের ওপর অবাস্তব কাজের লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হতো এবং তা পূরণের জন্য তাদের পরিবারকে জিম্মি করা হতো। কাজে অবহেলা বা বিদ্রোহ করলে রাজার ব্যক্তিগত বাহিনী ‘ফোর্স পাবলিক’ বিদ্রোহীদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিত। মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করতে তারা শিশুদের হাত কেটে ফেলার মতো নৃশংসতা চালাত।

ঐতিহাসিকদের মতে, এই ঔপনিবেশিক শোষণের কারণে কঙ্গোর জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখ থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েন এবং ইংরেজ সাংবাদিক ই. ডি. মোরেলের প্রতিবেদনে এই নিষ্ঠুরতা ফাঁস হলে ১৯০৮ সালে তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে বেলজিয়াম সরকার কঙ্গোকে নিজেদের হাতে নেয় এবং নাম দেয় ‘বেলজিয়ান কঙ্গো’। প্রশাসনিক কাঠামোয় কিছু উন্নয়ন এলেও স্থানীয় মানুষের রাজনৈতিক অধিকার তখনও ছিল না। তবে স্বাধীনতার দাবি থেমে থাকেনি। কয়েক দশকের আন্দোলনের পর ১৯৬০ সালে বেলজীয় শাসনের অবসান ঘটে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গোর যাত্রা শুরু হয়।

বুরুন্ডির রুগোম্বো শরণার্থী শিবিরে পুতুল হাতে একটি ছোট্ট মেয়ে, ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। নিজের দেশের যুদ্ধ থেকে বাঁচতে বহু কঙ্গোবাসী এই শিবিরে আশ্রয় নেয়। ছবি: এএফপি/বাসস

১৯৬০ সালে বেলজিয়ামের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন প্যাট্রিস লুমুম্বা। তিনি ছিলেন আফ্রিকার ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরোধা। কঙ্গোর স্বাধীনতার মূল অনুষ্ঠানে বেলজিয়ামের তৎকালীন রাজা বোদওঁয়া প্রথম বক্তব্য দেন। তিনি বক্তব্যে কঙ্গোর স্বাধীনতাকে বেলজিয়ামের ‘সভ্য করার মিশনের’ এক মহৎ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন এবং কঙ্গোকে রক্তচোষা ও নির্মম রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের ‘মেধার ফসল’ বলে প্রশংসা করেন। এই বক্তব্যটি ছিল কঙ্গোর জনগণের দীর্ঘদিনের লড়াই ও আত্মত্যাগের প্রতি চরম অপমান।

তার এই বক্তব্য শুনে মঞ্চে বসা কঙ্গোর নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে যান। মাইক হাতে নিয়ে লুমুম্বা সরাসরি বেলজিয়ামের রাজাকে উপেক্ষা করে কঙ্গোর সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমরা এই স্বাধীনতা বেলজিয়ামের দয়ায় পাইনি, এই স্বাধীনতা রক্ত, আগুন আর চোখের জলের তীব্র লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জন করেছি।’ তিনি তার ভাষণে ঔপনিবেশিক শাসনের আশি বছরের নির্মম দাসত্ব, জাতিগত বৈষম্য, চাবুকের আঘাত এবং কঙ্গোর সম্পদ লুণ্ঠনের নির্মম সত্যগুলো বিশ্বমঞ্চের সামনে অকপটে তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন

লুমুম্বার এই বক্তব্য সেদিন রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল। এটি আফ্রিকানদের আত্মমর্যাদার এক অনন্য দলিল হয়ে ওঠে, যা বেলজিয়াম সরকারকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। আর এই সাহসের মূল্য লুমুম্বাকে মাত্র কয়েক মাসের মাথায় নিজের জীবন দিয়ে হয়েছিল। সেই বক্তব্য পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, নতুন দেশে পুরোনো প্রভাব বজায় রাখা সহজ হবে না।

স্বাধীনতার মাত্র ১১ দিনের মাথায় ১১ জুলাই কঙ্গোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে খনিজসমৃদ্ধ প্রদেশ ‘কাতাঙ্গা’ বেলজিয়ামের উসকানিতে কঙ্গো থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করে। কঙ্গোর সোনা, তামা, কোবাল্ট এবং পারমাণবিক বোমার মূল উপাদান ইউরেনিয়ামের সিংহভাগই ছিল এই প্রদেশে। কাতাঙ্গার স্থানীয় নেতা মোইসে তসোম্বে নিজেকে কাতাঙ্গার প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। তসোম্বের এই সরকারই ছিল বেলজিয়ামের ‘পুতুল সরকার’, যা কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও বাস্তবে বেলজিয়ান খনি কোম্পানি, অর্থ এবং সেনা কর্মকর্তাদের ইশারায় চলত।

মরক্কো সফরের সময় ১৯৬০ সালের ৮ আগস্ট কঙ্গোর প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে ‘অর্ডার অব দ্য থ্রোন’-এর ‘গ্র্যান্ড কর্ডন’ উপাধিতে ভূষিত করেন দেশটির রাজা মোহাম্মদ পঞ্চম। ছবি: এএফপি/বাসস

লুমুম্বা এই বিচ্ছিন্নতাবাদকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। লুমুম্বা জানতেন, কাতাঙ্গার খনিজ সম্পদ ছাড়া কঙ্গো অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে। ফলে কাতাঙ্গার পুতুল সরকারের সঙ্গে লুমুম্বার তীব্র সংঘাত শুরু হয়। কাতাঙ্গা সংকট দমনে লুমুম্বা যখন জাতিসংঘ ও পশ্চিমাদের কোনো সাহায্য পেলেন না, তখন তিনি বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সামরিক সহায়তার আবেদন করেন। এটি আমেরিকার সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) এবং বেলজিয়ামের চোখ কপালে তুলে দেয়। তারা লুমুম্বাকে ‘কমিউনিস্ট’ তকমা দিয়ে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে।

১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি। কঙ্গোর ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয় এই দিনে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মাথায় কঙ্গোর সেনাবাহিনী প্রধান জোসেফ মোবুতুর প্রত্যক্ষ সহায়তায় আটক করা হয় প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে। এরপর বেলজিয়ান কর্মকর্তাদের তৈরি করা নীল নকশা অনুযায়ী তাকে বিমানে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার কট্টর শত্রু কাতাঙ্গার সেই বিচ্ছিন্নতাবাদী পুতুল সরকারের প্রধান মোইসে তসোম্বের ডেরায়। তবে লুমুম্বা একা ছিলেন না। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার পাশ থেকে সরে যাননি তার দুই বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ ছায়াসঙ্গী–স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোরিস এমপোলো এবং কঙ্গোলিজ বিন্যস্ত সিনেটের ভাইস-প্রেসিডেন্ট জোসেফ ওকিটো। হাতকড়া পরা অবস্থায় এই তিন নেতাকে একই বিমানে কাতাঙ্গায় নিয়ে আসা হয়।

১৭ জানুয়ারি বিকালে বিমানটি কাতাঙ্গার এলিজাবেথভিল (বর্তমান লুবুম্বিশি) বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর থেকে শুরু হয় পাশবিক নির্যাতন। কাতাঙ্গার বিচ্ছিন্নতাবাদী সৈন্য এবং বেলজিয়ান অফিসাররা এই তিনজনকে নির্মমভাবে মারধর করতে করতে বিমান থেকে নামায়। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ‘ভিলা ব্রাউয়েজ’ নামের একটি সুরক্ষিত বাড়িতে। সেখানে কাতাঙ্গার প্রেসিডেন্ট মোইসে তসোম্বে এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বেলজিয়ান কর্মকর্তাদের চোখের সামনে এই তিন নেতার ওপর কয়েক ঘণ্টা ধরে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পৈশাচিক উল্লাসে উপড়ে ফেলা হয় লুমুম্বার দাড়ি, চাবুক আর বুটের লাথিতে রক্তে রঞ্জিত ও পঙ্গু করে দেওয়া হয় ওকিটো ও এমপোলোর শরীর। কিন্তু এত নির্যাতনের পরও তাদের আদর্শিক অবিচলতাকে ভাঙা যায়নি।

রাত তখন ১০টা। লুমুম্বা, এমপোলো এবং ওকিটোকে একটি গাড়ির পেছনে হাত-পা বেঁধে প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় তোলা হয়। তাদের শেষ গন্তব্য ছিল শহর থেকে কিছুটা দূরে, সিলুয়ে নামক একটি প্রত্যন্ত বনের ভেতর। এই পুরো হত্যা অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন বেলজিয়ান পুলিশ কমিশনার ফ্রান্স ভান্দেওয়াল এবং বেলজিয়ান ক্যাপ্টেন জুলিয়েন গাট। ফায়ারিং স্কোয়াডটি গঠন করা হয়েছিল চারজন কাতাঙ্গানি সৈন্য এবং চারজন বেলজিয়ান সেনা অফিসারের সমন্বয়ে।

১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে আটকের পর সেনাদের প্রহরায় প্যাট্রিস লুমুম্বা (ডানে) এবং জোসেফ ওকিতো (বামে)। ছবি: এএফপি/বাসস

বনের ভেতর একটি বিশাল গাছের সামনে গাড়িগুলো থামানো হয়। গাড়ির হেডলাইটের আলোতে সেখানে আগে থেকে বেলজিয়ান অফিসারদের তত্ত্বাবধানে একটি বড় গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। লুমুম্বাকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করার জন্য বেলজিয়ান ক্যাপ্টেন তার চোখের সামনেই তার দুই সহযোগীকে আগে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।

রাত তখন পৌনে ১২টা। প্রথমে সিনেটের ভাইস-প্রেসিডেন্ট জোসেফ ওকিটোকে গাছের সামনে দাঁড় করানো হয়। বেলজিয়ান ক্যাপ্টেনের আদেশে ফায়ারিং স্কোয়াডের রাইফেলগুলো একসঙ্গে গর্জে ওঠে। ওকিটোর নিথর দেহটি ছিটকে পড়ে গর্তের ভেতর। এর ঠিক এক মিনিট পর বীর তরুণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোরিস এমপোলোকে সেই একই জায়গায় এনে দাঁড় করানো হয়। বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান তিনি। দ্বিতীয় দফায় ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে তিনিও ওকিটোর মরদেহের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়েন।

দুই প্রিয় সহযোদ্ধার রক্তাক্ত মৃত্যুর পর সবার শেষে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে আনা হয় কঙ্গোর স্বাধীনতার মহানায়ক প্যাট্রিস লুমুম্বাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, প্রচণ্ড মারধরে শরীর ভেঙে পড়লেও লুমুম্বার চোখ ছিল শান্ত, অবিচল ও নির্ভীক। তিনি সরাসরি বেলজিয়ান ক্যাপ্টেন জুলিয়েন গাটের চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়ান। ক্যাপ্টেন গাট নিজেই ফায়ারিং স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিয়ে চূড়ান্ত গুলি করার নির্দেশ দেন। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁঝরা হয়ে যায় লুমুম্বার বুক ও মাথা। সময় তখন রাত ১১টা ৪৫ মিনিট।

হত্যাকাণ্ড শেষ হওয়ার পর বেলজিয়ান অফিসারদের উপস্থিতিতে এই তিন মরদেহ সেই বনের ভেতরের অগভীর গর্তে তড়িঘড়ি করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এর পরদিন রাতে প্রমাণ লোপাটের জন্য বেলজিয়ান পুলিশ কর্মকর্তা জেরার্ড সোয়েতে এবং তার ভাই মরদেহগুলো আবার কবর থেকে তুলে টুকরো টুকরো করেন এবং সালফিউরিক অ্যাসিডের ড্রামে ডুবিয়ে সম্পূর্ণ গলিয়ে ছাই করে দেন।

ব্রাসেলসের এক অনুষ্ঠানে প্যাট্রিস লুমুম্বার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে তার সন্তানেরা (বাম থেকে) রোল্যান্ড, জুলিয়ানা এবং ফ্রাঁসোয়া। মৃত্যুর ৬১ বছর পর বেলজিয়ামে এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বার অবশিষ্টাংশ তার সন্তানদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০২২ সালের ২০ জুন। ছবি: এএফপি/বাসস

মরদেহ অ্যাসিডে গলানোর সময় জেরার্ড সোয়েতে লুমুম্বার সোনা দিয়ে বাঁধানো দাঁতটি নিজের কাছে রেখে দেন। পরে তিনি সেটি বেলজিয়ামে নিয়ে যান এবং প্রায় চার দশক ধরে তা নিজের বাড়িতে একটি শিকারি ট্রফির মতো গোপন বাক্সে রেখে দিয়েছিলেন।

১৯৯৯ সালে সমাজবিজ্ঞানী লুদো ডি ভিট তার বিখ্যাত বই দ্য অ্যাসাসিনেশন অব লুমুম্বাতে জেরার্ড সোয়েতের জড়িত থাকার কথা ফাঁস করেন। এরপর ২০০০ সালে বেলজিয়ামের একটি টিভি সাক্ষাৎকারে জেরার্ড সোয়েতে কলুমুম্বার দাঁত নিজের কাছে রাখার কথা স্বীকার করেন। এর কিছুদিন পরে, ২০০০ সালের জুনে তিনি মারা যান।

জেরার্ড সোয়েতে স্বীকার করলেও বেলজিয়াম পুলিশ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়িতে অভিযান চালায়নি। ২০১৬ সালে জেরার্ড সোয়েতের মেয়ে গডেলিভ সোয়েতে একটি ম্যাগাজিনকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে অবলীলায় লুমুম্বার সেই দাঁতটির কথা আবার উল্লেখ করেন এবং দাঁতটির একটি ছবি দেখান।

এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর কঙ্গোর অধিকারকর্মী এবং লুমুম্বার পরিবার বেলজিয়ামের আদালতে আনুষ্ঠানিক চুরির মামলা ও দেহাংশ উদ্ধারের আবেদন করেন। এরপর ২০১৬ সালে বেলজিয়ামের ফেডারেল প্রসিকিউটররা সোয়েতের মেয়ের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে দাঁতটি আইনিভাবে জব্দ করে ব্রাসেলসের প্যালেস অব জাস্টিসে সুরক্ষিত রাখেন।

দাঁতটি উদ্ধার হওয়ার পরও বেলজিয়াম সরকার তা সরাসরি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে পারেনি বা চায়নি। এর পেছনে দুটি বড় কারণ ছিল লুমুম্বার হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেলজিয়ামের আদালতে একটি যুদ্ধাপরাধের তদন্ত চলমান ছিল। আইনি প্রমাণ  হিসেবে এই দাঁতটি হস্তান্তরের জন্য আদালতের বিশেষ আদেশের প্রয়োজন ছিল। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বেলজিয়ামের আদালত রায় দেয়, দাঁতটি পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া যাবে। ২০২০ সালের শেষদিকে কফিনটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারণে কঙ্গো এবং বেলজিয়াম–উভয় দেশের সরকার রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

অবশেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কঙ্গোর স্বাধীনতার ৬২তম বার্ষিকীকে সামনে রেখে ২০২২ সালের ২০ জুন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেশটির সরকার লুমুম্বার সন্তানদের কাছে সেই দাঁতটি আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত দেয়। তখন বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু বেলজিয়াম সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং নৈতিক দায় স্বীকার করেন। এর আগে, ২০০২ সালে বেলজিয়ামের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুই মিশেল দেশটির সংসদের তদন্ত রিপোর্টের পর লুমুম্বার পরিবার ও কঙ্গোর মানুষের কাছে প্রথমবার বেলজিয়ামের ‘নৈতিক দায়’ স্বীকার করে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।

২০২১ সালের ১২ জানুয়ারি কাটাঙ্গা প্রদেশের শিলাতেম্বো এলাকায় প্যাট্রিস লুমুম্বার স্মৃতিস্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে কঙ্গোলিজ ইতিহাসবিদ গুইলোম এনকোঙ্গোলো। ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি এই স্থানে লুমুম্বাকে হত্যা করা হয়েছিল। ছবি: এএফপি/বাসস

একটি ছোট নীল রঙের কফিনে করে লুমুম্বার একমাত্র অবশিষ্ট দেহাংশ (সেই দাঁতটি) কঙ্গোতে ফিরিয়ে আনা হয়। কফিনটি নিয়ে লুমুম্বার পরিবার যখন কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় পৌঁছায়, তখন পুরো দেশজুড়ে তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছিল। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের মহান নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়। ১৯৬১ সালের হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৬১ বছর পর, ২০২২ সালের ৩০ জুন কঙ্গোর ৬২তম স্বাধীনতা দিবসে কিনশাসায় সেই দাঁতটি সমাহিত করা হয়।

কঙ্গোলিজ চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিক কাবেইয়া তার ‘ফ্রম প্যাট্রিস টু লুমুম্বা’ প্রামাণ্যচিত্রের প্রেক্ষাপটে দ্য গার্ডিয়ানকে জানান, এই হত্যাকাণ্ডের পর একনায়ক মোবুতুর ৩০ বছরের শাসনামলে ভয়ে মানুষ লুমুম্বার নাম মুখে আনতেও সাহস পেত না। একই সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র কঙ্গো স্টেশন চিফ ল্যারি ডেভলিনের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের নির্দেশে লুমুম্বাকে বিষাক্ত টুথপেস্টের মাধ্যমে পোলিও ভাইরাসে আক্রান্ত করে মেরে ফেলার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল।

১৯৬৫ সালে সেনাপ্রধান জোসেফ মোবুতু সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে প্রায় তিন দশক একনায়কতান্ত্রিক শাসন চালান। ১৯৭১ সালে তিনি দেশের নাম পরিবর্তন করে ‘জায়ার’ রাখেন, যে নামে ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে খেলেছিল দলটি। তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি ক্রমে ভেঙে পড়ে।

১৯৯৭ সালে মোবুতুর পতন হলেও সংকট শেষ হয়নি। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার পর লাখো শরণার্থী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী দেশে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর জেরে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৭ এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দুটি ভয়াবহ যুদ্ধ হয়।

২০২৫ সালের ৫ মার্চ রুয়াবায়ার একটি খনিতে ‘এম২৩’গোষ্ঠীর সমাবেশে খনি শ্রমিকরা। ৩০ বছর ধরে সংঘর্ষে বিপর্যস্ত পূর্ব কঙ্গোয় বিশ্বের ৬০-৮০ শতাংশ কোলটান সঞ্চিত রয়েছে। জাতিসংঘের মতে, এই খনিজ উৎপাদন ও বাণিজ্যে কর বসিয়ে রুয়াবায়া থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮ লাখ ডলার আয় করে এম২৩। ছবি: এএফপি/বাসস

এই যুদ্ধে আফ্রিকার একাধিক দেশ জড়িয়ে পড়েছিল এবং যুদ্ধ, অনাহার ও রোগে প্রায় ২৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এ কারণে গবেষকরা একে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘আফ্রিকার বিশ্বযুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেন। মোবুতুর পতনের পর লরাঁ দেজিরে কাবিলা ক্ষমতায় এসে দেশের পুরোনো নাম ‘ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো’ পুনর্বহাল করেন।

২০০১ সালে তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি হন জোসেফ কাবিলা। যদিও এরপর দেশ পুনর্গঠনের পথে হাঁটতে শুরু করে, তবু পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকট আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

ঐতিহাসিকভাবে ‘কঙ্গো’ নামটি এসেছে কঙ্গো নদী ও কঙ্গো রাজ্য থেকে। ঔপনিবেশিক যুগে নদীর পূর্ব তীর ছিল বেলজিয়ামের নিয়ন্ত্রণে, আর পশ্চিম তীর শাসন করত ফ্রান্স। স্বাধীনতার পর দুটি রাষ্ট্র ‘কঙ্গো’ নাম ব্যবহার করতে শুরু করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

এই বিভ্রান্তি এড়াতে রাজধানীর নাম অনুসারে একটিকে ‘কঙ্গো কিনশাসা’ এবং অন্যটিকে ‘কঙ্গো ব্রাজাভিল’ নামে ডাকা শুরু হয়। ১৯৭১ সালে নাম বদলে ‘জায়ার’ রাখা হলেও ১৯৯৭ সালে আবার ডিআর কঙ্গো নামটি ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দুই দেশের পূর্ণ নাম ব্যবহার করা হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাটারি তৈরিতে যে খনিজগুলোর প্রয়োজন হয়, সেগুলোর বড় একটি অংশ আসে এই দেশ থেকে। অথচ বৈপরীত্য হলো বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও দেশটির কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও সহিংসতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।

রুসিজি জেলার ন্যাব্রুশিসি ট্রানজিট ক্যাম্পে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার পর পূর্ব কঙ্গো থেকে সদ্য আগত শরণার্থীরা ত্রাণের খাদ্য সংগ্রহ করতে বালতি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবি: এএফপি/বাসস

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই দেশে কোবাল্ট, তামা, ট্যানটালাম, টিন, সোনা এবং হীরার বিশাল মজুত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোবাল্ট, যার বৈশ্বিক বাজারের সবচেয়ে বড় উৎস এটি। পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই খনিজ সম্পদের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

কিন্তু এত সম্পদও মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারেনি। পূর্বাঞ্চলের অনেক খনিজসমৃদ্ধ এলাকায় এখনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। খনিজ উত্তোলন ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংঘাত, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কারণে অর্জিত রাজস্ব সাধারণ মানুষের উন্নয়নে কাজে লাগে না।

খনিজ ছাড়াও দেশটির বুক চিরে বয়ে গেছে আফ্রিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম কঙ্গো নদী, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বে বিশাল সম্ভাবনাময়। এ ছাড়া, এখানকার কঙ্গো বেসিন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রান্তীয় বনাঞ্চল, যা পৃথিবীর জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষা এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা এখনো নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, টেকসই শান্তি এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই উন্নয়নের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

খেলার মাঠে জয়-পরাজয় আসতেই পারে, সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু কঙ্গোর মতো একটি দেশের বিশ্বমঞ্চে আসা মানে কেবল ফুটবল খেলা নয়। তাদের জার্সির পেছনে লুকিয়ে আছে শত বছরের অত্যাচার, যুদ্ধ আর কান্নার ইতিহাস। ফুটবল হয়তো তাদের ভাগ্য বদলে দেবে না, কিন্তু এই খেলা বছরে পর বছর ধরে মার খাওয়া কঙ্গোর সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে একটু হাসার, একটু বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। দীর্ঘ ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা তাই তাদের কাছে শুধু একটি টুর্নামেন্ট খেলা নয়, এটি আসলে শত কষ্টের মাঝেও মাথা উঁচু করে টিকে থাকার গল্প।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad