আত্মিক বন্ধনের নিঃস্বার্থ সম্পর্ক

আত্মিক বন্ধনের নিঃস্বার্থ সম্পর্ক
Advertisement
Advertisement

বন্ধুত্ব মানুষের জীবনে সবচেয়ে নিঃস্বার্থ আর মূল্যবান সম্পর্কগুলোর মধ্যে একটি। যে সম্পর্কে রক্তের কোনো টান থাকে না, তবু আত্মার বন্ধনে এই সম্পর্ক হয়ে ওঠে আরও গভীর এবং চির অটুট। এই সম্পর্কে নেই কোনো বাধ্যবাধকতা, নেই বাড়তি কোনো শর্ত। বন্ধুকেই অবলীলায় বলা যায় নিজের আনন্দ, বেদনা, সুখ-দুঃখ, ব্যাথার গল্পগুলো। এমন এক সম্পর্কের গুরুত্ব ও সৌন্দর্যকে সম্মান জানাতেই প্রতি বছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্ধুদের সঙ্গ, ভালোবাসা ও সমর্থনের স্বীকৃতি হিসেবে দিনটি উদযাপন করা হয়।

বন্ধু দিবস পালনের ধারণাটি প্রথম আসে ১৯৩০ সালে। হলমার্ক কার্ডস-এর প্রতিষ্ঠাতা জয়েস হল প্রস্তাব করেছিলেন, ২ আগস্ট দিনটিকে এমন একটি দিন হিসেবে পালন করা হোক, যেদিন মানুষ শুভেচ্ছা কার্ড পাঠিয়ে তাদের প্রিয় বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। শুরুতে এ উদ্যোগ জনপ্রিয়তা পেলেও, পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় এর জনপ্রিয়তা কিছুটা হ্রাস পায়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন্ধু দিবস উদযাপনের বিষয়টি নতুন গতি পায় ১৯৫৮ সালে। সে বছর প্যারাগুয়ের পুয়ের্তো পিনাসকো শহরে বন্ধুদের এক সমাবেশে রামোন আর্তেমিও ব্রাচো বন্ধু দিবস উদযাপনের প্রস্তাব দেন। তার এই উদ্যোগের ফলেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড,’ যার লক্ষ্য ছিল বিশ্বের মানুষের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছড়িয়ে দেওয়া।এর বহু বছর পর, ২০১১ সালে, জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস (ইন্টারন্যাশনাল ডে অব ফ্রেন্ডশিপ) হিসেবে ঘোষণা করে।

জাতিসংঘ ৩০ জুলাই নির্ধারণ করলেও বাংলাদেশসহ অনেক দেশে প্রতি বছর আগস্ট মাসের প্রথম রোববার বন্ধু দিবস পালিত হয়। এ বছর দিনটি পড়েছে ২ আগস্ট। সেই হিসাবে আজ বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

মানুষের জীবনে একজন ভালো বন্ধুর প্রভাব ঠিক কতখানি তা ঠিক শব্দে ব্যাখ্যা করা যাবে না। নির্ভেজাল বন্ধুত্ব মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, ভরসার জায়গা। বন্ধুর কাছে আনন্দে প্রাণ খুলে যেমন হাসা যায়, আবার দুঃখে কাঁদা যায়। কাছের বন্ধু আনন্দ উদযাপনে যেমন সামিল হয়, আবার খারাপ সময়েও ছায়ার মোট পাশে থাকে। বন্ধুত্বের কোনো বয়স হয় না, দেশ-কাল-সীমানা-বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে যে কারো সঙ্গে যে কেউ বন্ধুত্ব পাতাতে পারে। আর এভাবেই স্বার্থহীন বন্ধুত্বের সেই সম্পর্ক কারো জীবনে আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে অনেক মানুষ আসে আর যায়। কিন্তু সবাই সবার বন্ধু হয় না। একজন সত্যিকারের বন্ধুই থেকে যায় জীবন সায়াহ্নে। সময়ের ব্যবধানে কাছে বা দূরে যেখানেই সে থাকুক, চিরকাল মনের খুব কাছাকাছিই হয় তার বিচরণ। যাপিত অনেক টক-ঝাল-মিষ্টি স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকে সেই বন্ধু। জীবনে এক অন্যরকম বন্ধনে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে সে।

আরও পড়ুন

‘পথের পাঁচালী’ ছবির শুটিংয়ে ‘অ্যাকশন’ বা ‘কাট’ বলার আগে এক মহান নির্মাতা প্রায়ই স্নায়ুচাপে ভুগতেন। আর ঠিক সেই সময় তার পাশে থাকতেন এমন একজন, যিনি কোনো কথা ছাড়াই পরিচালকের নীরবতা ও মানসিক অবস্থাকে গভীরভাবে বুঝতে পারতেন।

বলছিলাম, কিংবদন্তি গল্পকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং তার ঘনিষ্ট বন্ধু, দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্তের কথা। যার ছায়ায় মানসিক প্রশান্তি পেতেন এই পরিচালক। তার উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তার মুহূর্তে তার এই কাছের বন্ধুই ছিল তার পরম আস্থার নির্ভরতা।

শুটিংয়ের সময় যখন স্নায়ুচাপে সত্যজিৎ রায়ের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যেত, তখন বংশী চন্দ্রগুপ্তই তার হয়ে ‘অ্যাকশন’ ও ‘কাট’ বলে শুটিং এগিয়ে নিতেন। এতে পরিচালক তার চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তগুলো সহজে সামলে উঠতে পারতেন।

তাদের বন্ধুত্ব শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণশিল্প ও কারিগরি কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৫৯ সালে নির্মিত ‘অপুর সংসার’ ছবির শুটিংয়ের সময় বংশীই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে, তিনি অনায়াসে পরিচালকের সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দিতে পারতেন। অন্য কারও এমনটা করার সাহস বা ঘনিষ্ঠতা ছিল না।

বহু বছর পরেও এই ছোট্ট ঘটনাটি কেবল এক টুকরো স্মৃতি হয়েই থাকেনি। এটি এক অসাধারণ বন্ধুত্বের নিদর্শন হয়ে উঠেছে। এমন এক বন্ধুত্ব, যা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর জন্ম দিতে প্রেরণা জুগিয়েছিল—যেখানে এক বন্ধু যেন আক্ষরিক অর্থেই আরেক বন্ধুর সৃষ্টিশীলতার শিখা জ্বালিয়ে রেখেছিলেন।

এমন সব বন্ধুত্বের বহু গল্প-গাথা, বাস্তব কাহিনি রয়েছে। যা পড়লে বা জানলে আলাদা ভালো লাগায় মন আন্দোলিত হয়। বন্ধুত্বের এই গভীরতার কাহিনি যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে থেকে যায়। যদিও খাঁটি বন্ধুত্বের সন্ধান পাওয়া বেশ কঠিন, কিন্তু একবার এমন বন্ধুত্বের খোঁজ পাওয়া গেলে জীবনের একাকিত্ব ঘুচে গিয়ে পরিপূর্ণতা আসে।

তাই আগস্টের প্রথম রোববার হোক বা জাতিসংঘের ঘোষিত আন্তর্জাতিক দিবস- বন্ধুতা উদযাপন আসলে প্রতিদিনের আর বন্ধুত্ব চিরকালের, চির অমলিন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad