প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করেছে লেবানন। মঙ্গলবার দেশটির পার্লামেন্টে এই সংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়।
এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে দীর্ঘদিনের বিচারিক মৃত্যুদণ্ড প্রথার চূড়ান্ত অবসান ঘটল। বৈরুত থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর নিশ্চিত করেছে।
লেবাননে ২০০৪ সালের পর থেকে আর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও আদালতগুলোতে এ সংক্রান্ত রায় দেওয়া অব্যাহত ছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৮৫ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কারাগারে বন্দী ছিলেন।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে জানানো হয়, হত্যা, সন্ত্রাসবাদ ও গুপ্তচরবৃত্তির মতো যেসব অপরাধে পূর্বে মৃত্যুদণ্ডের সাজা ছিল, এখন থেকে সেসব মারাত্মক অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হবে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
পার্লামেন্টে উপস্থিত দেশটির বিচারমন্ত্রী আদেল নাসার এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি জানান, মৃত্যুদণ্ড উঠে যাওয়ায় এখন বিদেশে থাকা আসামিদের লেবাননে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত জটিলতা দূর হবে। স্বাধীন আইনপ্রণেতা ফিরাস হামদান ও বিভিন্ন অধিকার রক্ষা সংস্থা একে বড় জয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতা ফিরাস হামদান এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সিদ্ধান্তটির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই মুহূর্তে পৌঁছাতে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’
জাতিসংঘও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক মধ্যপ্রাচ্যের যেসব প্রতিবেশী দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, তাদের লেবাননের পথ অনুসরণ করে ‘এই অমানবিক প্রথা বন্ধের’ আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে এই সিদ্ধান্ত ‘জীবনের অধিকারের প্রতি শক্তিশালী ও নীতিনিষ্ঠ অঙ্গীকার’ প্রকাশ করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, লেবানন ‘মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশের জন্য শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।’ লেবাননের সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক ও সাহসী’ বলে অভিহিত করেছে।
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো এক্সে লিখেছেন, এই ভোট প্রমাণ করে লেবানন ‘তার অস্তিত্বের ভিত্তিতে থাকা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার সক্ষমতার মাধ্যমে এখনো একটি দৃষ্টান্ত।’
‘মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সম্মান’
অ্যাক্টিভিস্ট ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বহু বছরের প্রচাররে পর আইনটি পাস হলো।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেবাননবিষয়ক গবেষক রামজি কাইস এএফপিকে বলেন, এই সিদ্ধান্ত ‘দেশটির মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি এমন একটি নিষ্ঠুর ও স্বেচ্ছাচারী শাস্তি থেকে স্পষ্ট বিচ্ছেদ, যা কখনোই দেওয়া উচিত নয়।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছে। সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক হেবা মোরায়েফ বলেন, ‘এই আইনকে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কার্যকর করতে লেবাননের কর্তৃপক্ষকে এখন সব মৃত্যুদণ্ডের রায় কমিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুমোদন দিতে হবে। পাশাপাশি মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বৃহত্তর সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।’
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, গত বছর ইরানে ২ হাজারের বেশি এবং সৌদি আরবে ৩৫০টির বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
জুনে জর্ডান নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ছয় ব্যক্তিকে ফাঁসি দেয়। এর মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর দেশটির নয় বছরের স্থগিতাদেশের অবসান ঘটে।
প্রতিবেশী ইসরাইলে মাত্র দুবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এক সামরিক ক্যাপ্টেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর ১৯৬২ সালে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী অ্যাডলফ আইখম্যানকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসরাইলের পার্লামেন্ট প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অনুমতি দিয়ে নতুন আইন পাস করেছে।
জাতিসংঘে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশের পক্ষে লেবানন বারবার ভোট দিয়েছে। এ বিষয়ে ২০২৪ সালের একটি প্রস্তাবও সমর্থন করেছে দেশটি।
লেবাননে জাতিসংঘের বিশেষ সমন্বয়কারী জ্যঁ আরনো বলেন, সর্বশেষ পদক্ষেপটি ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে ন্যায়বিচারের প্রতি দেশটির অঙ্গীকার আরও এগিয়ে নিয়েছে।’
চলমান আইনসভা অধিবেশনে আলোচনার জন্য উত্থাপিত একাধিক বিলের অংশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে। এসব বিলের মধ্যে বহু বছর ধরে আলোচিত সাধারণ ক্ষমা আইনও রয়েছে।


