বাংলাদেশে আল-কায়দা: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উদ্বেগ

বাংলাদেশে আল-কায়দা: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উদ্বেগ
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশে নিজেদের গোপন নেটওয়ার্ক বা ‘সেল’ গড়ে তুলতে চায় ‘ভারত উপমহাদেশীয় আল-কায়দা’ (একিউআইএস)। বাংলাদেশকে ব্যবহার করার এই চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব অনুসরণে গঠিত ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর ৩৮তম প্রতিবেদনটি গত ১০ আগস্ট প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা সার্বিকভাবে প্রায় একই রকম থাকলেও আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তা আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশে গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে হাতে তৈরি বোমা উদ্ধার এবং বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন জঙ্গি গ্রেপ্তারের ঘটনার পরই জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন সামনে এলো।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে একের পর এক হামলার কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে আছে।

ভারত ও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারতের দিল্লিতে লাল কেল্লায় যে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, সেটির পেছনে একিউআইএস-এর হাত রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পাশাপাশি এতে বলা হয়, বাংলাদেশে গোপন আস্তানা ও নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য একিউআইএস যেভাবে দেশটিকে ব্যবহার করতে চাইছে, তা বেশ উদ্বেগের বিষয়।

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনে দুবার দায়িত্ব পালন করা সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। সাধারণত অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিরাই এসব কমিটিতে থাকেন এবং তারা যুক্তিসঙ্গত পরামর্শ দেন। রাজনৈতিক কোনো প্রভাব বা ভিন্ন উদ্দেশ্য না থাকলে এসব কমিটির প্রতিবেদন নিরাপত্তা পরিষদ সাধারণত গ্রহণ করে থাকে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানান, আল কায়দা বা আইএস-এর চিন্তাধারায় বিশ্বাসী কিছু চরমপন্থী বাংলাদেশে সক্রিয় আছে। তবে তারা নিজেদের আড়ালে রাখতেই পছন্দ করে।

আরও পড়ুন

তিনি আরও বলেন, এরা মূলত লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে ‘স্লিপার সেল’ হিসেবে কাজ করে। তবে সুযোগ বুঝে কিংবা সরকার দুর্বল ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অসমর্থ মনে করলে তারা প্রকাশ্যে এসে বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড শুরু করে।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, একিউআইএস বা অন্য কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যাতে বাংলাদেশে নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করতে না পারে, সেজন্য ঢাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কর্তৃপক্ষের সবসময় কড়া নজরদারি রাখা উচিত।

এই প্রতিবেদনটি ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই সময়ে আল কায়দার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে, পরবর্তী পর্যালোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হতে চলেছে।

প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, আল কায়দা যদি এই বিশেষ দিনগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্বজুড়ে একটি সক্রিয় গোষ্ঠী হিসেবে তাদের গুরুত্ব যে ক্রমশ কমছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র

প্রতিবেদনে জানানো হয়, আল-কায়দা ও আইএস (দায়েশ) দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালিয়ে আসছে। অবশ্য প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে তারা এখনো এতে সফল হতে পারেনি।

তবে এসব বিপজ্জনক অস্ত্র তৈরির নিয়ম ও কৌশল অনলাইন চরমপন্থী প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে আইএসের ইংরেজি সাময়িকী ‘ইনভেড’-এ বোটুলিনাম টক্সিন ও সায়ানাইডের মতো মারাত্মক বিষাক্ত পদার্থ তৈরির নিয়ম প্রকাশ করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএস-খোরসান (আইএসআইএল-কে) জৈব বিষ তৈরিতে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত এক বছরে তারা ‘রাইসিন’ নামের বিষাক্ত উপাদান তৈরির নির্দেশিকা প্রচার করেছে।

এতে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের শেষের দিকে ভারতের পুলিশ এক চিকিৎসকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, বিদেশভিত্তিক একটি আইএস সেল তাদের রাইসিন তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিল।

প্রতিবেদনে আবারও মনে করিয়ে দেওয়া হয়, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সীমানা সংলগ্ন এলাকায় টানা হামলার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ থমথমে হয়ে আছে।

জাতিসংঘের এই সর্বশেষ মূল্যায়ন থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার সুযোগ নিয়ে কিভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad