ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হল ও ক্যানটিনগুলোর খাবার এতটাই খারাপ যে, বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। তবে এই ব্যবস্থা সামলাতে গিয়ে ক্ষতি হচ্ছে তাদের পড়ালেখা।
নিজেদের উদ্যোগে ‘ভালো’ খাবারের এই ব্যবস্থার নাম ‘মেস প্রথা’। এখানে শিক্ষার্থীদের নিজেদেরই খাবারের টাকা তুলতে হয়, বাজারে যেতে হয় এবং ক্লাস-পরীক্ষার চাপের মধ্যে ভোর ৪টা থেকে রান্নাবান্নার দেখভাল করতে হয়।
দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বড় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী পুষ্টিহীনতার কারণে বেশ রোগা ও কম ওজনের। বছরের পর বছর ধরে খারাপ খাবার ও পুষ্টির অভাবে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট পেলেও এর কোনো সমাধান মিলছে না।
রাজনৈতিক পরিবর্তন, ছাত্র আন্দোলন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত কমিটি ডাইনিং হলের বা ক্যানটিনের খাবারের মান বদলাতে পারেনি।
সব হলে ডাইনিং বা খাবারের ব্যবস্থা নেই। তাই অনেককে ক্যানটিন থেকে কিনে খেতে হয়। কিন্তু সেখানে বাড়তি দাম দিয়েও ভালো খাবার মেলে না। যেমন, সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে কোনো ক্যানটিন বা ডাইনিং নেই, সেখানে পুরো হলই মেস প্রথার ওপর চলে।
প্রতি ১৫ দিনের জন্য তিনজন শিক্ষার্থী একটি করে মেস পরিচালনার দায়িত্ব নেন। বাজার করা থেকে শুরু করে রান্নার সব তদারকি তাদেরই করতে হয়।
এসএম হলের এক মেস পরিচালক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র ইমামুল আখোয়ান। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতিদিনের খাবারের তালিকা করা, টাকা তোলা, টাকা জমা রাখা আর ভোরে উঠে বাজার করা–সব মিলিয়ে এক বিশাল ভোগান্তি।’
ফজরের আজানের পরপরই তিনি অন্যদের সঙ্গে কারওয়ান বাজারে যান। বাজার করে বাবুর্চির হাতে বুঝিয়ে দিয়ে হিসাব মেলাতে মেলাতে সকাল ৯টা বেজে যায়।
দুপুরের খাবারের জন্য ১২টা থেকে ২টা এবং রাতের খাবারের জন্য ৭টা থেকে ৯টা বা ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত তদারকি করতে হয়।
ইমামুল আরও বলেন, ‘এটা এক বিরাট ঝামেলা। হিসাব মিলল কি না, ভাত বেশি শক্ত হয়ে গেল কি না–সব সময় এসব চিন্তা মাথায় থাকে। আমরা তো এসব করতে এখানে পড়তে আসিনি। দেখা যায় পরীক্ষার দিনও এই কাজ করতে গিয়ে পরীক্ষা খারাপ হয়ে যায়।’
তা সত্ত্বেও একটু ভালো খাবার আর সঠিক তদারকির আশায় শিক্ষার্থীরা এই কষ্ট মেনে নিচ্ছেন।
মহসীন হলের ছাত্র ইয়াসিনুর রহমান পরান টাইমসকে জানান, ‘হলে বাসি খাবার দেওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। গতকালের বেঁচে যাওয়া ভাত বা ডাল পরদিন দিয়ে দেওয়া হয়। মাছের তরকারি একদমই খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না। দু-একটি হল ছাড়া সব হলেরই একই অবস্থা। নোংরা পানির কারণে কয়েকটি হলের ক্যানটিন বন্ধও করে দিতে হয়েছে।’
সম্প্রতি মাস্টারদা সূর্য সেন হলের ডাইনিং পরিদর্শন করে একদল শিক্ষার্থী। তাদের পরিদর্শনে সামনে আসে ডাইনিং হলের ভয়াবহ চিত্র।
পরিদর্শন দলের সদস্য মাশনুন স্নিগ্ধ বলেন, ‘আমরা গিয়ে দেখি পোড়া ও নোংরা তেলে রান্না হচ্ছে, বাসি আটা দিয়ে পরোটা ভাজা হচ্ছে। ফ্রিজে জমা করে রাখা হয়েছে রক্তমাখা কাঁচা মাংস, পচা সবজি আর পুরোনো ভর্তা। এসব দেখে আমাদের খাওয়ার ইচ্ছাই মরে গেছে। আমরা এই খাবার খাই ভেবে নিজেদেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না।’
তবে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী দিহানের মতে, এর জন্য শিক্ষার্থীদের মানসিকতাও কিছুটা দায়ী। তিনি বলেন, ‘মুজিব হলের নতুন ক্যানটিনে ভালো খাবার একটু বেশি দামে বিক্রি হয়, কিন্তু ছাত্ররা সেখানে খায় না। অথচ হলের বাইরে গিয়ে ঠিকই বেশি দামে খায়।’
হল সংসদের এক সদস্য জানান, খাবারের দাম বাড়লেও মানের কোনো উন্নতি হয় না। কড়া নজরদারি করলে কিছুদিন ভালো থাকে, তারপর ক্যানটিন মালিকরা বেশি লাভের জন্য আবার খারাপ খাবার দেওয়া শুরু করে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্যানটিনগুলোতে একটি ‘চাঁদপুর সিন্ডিকেট’ কাজ করে, যা অন্য কাউকে এই ব্যবসা করতে দেয় না।
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের আগে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত জোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা পুষ্টিবিদদের দিয়ে ভালো খাবারের মেনু করবে। প্রতি তিন মাস পর খাবার পরীক্ষা করবে। কিন্তু নির্বাচনে জেতার পর সেসব প্রতিশ্রুতি আর পূরণ হয়নি।
এফ রহমান হলের ছাত্র ওমর ফারুক বলেন, ‘খাবারের মানের কোনো উন্নতি হয়নি। ডালে শুধুই পানি, মাংসে প্রচুর টেস্টিং সল্ট আর তেহারিতে অতিরিক্ত মসলা।’
জিয়া হলে সাধারণ মুরগি, জাটকা বা রুই মাছ দিয়ে ভাতের দাম ৫০ টাকা, আর সোনালি মুরগি দিয়ে খাবার ৭০ টাকা। ডিম-খিচুড়ি ৪০ টাকা এবং শাক ১০ টাকা। আর পাতলা ডাল দেওয়া হয় বিনামূল্যে। অন্যান্য হলেও দাম প্রায় একই।
এসএম হলের মেস ম্যানেজার মীর ইমাম জানান, মেসের খাবারের খরচ ক্যানটিনের মতোই, কিন্তু মান অনেক ভালো। কারণ সেখানে কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা বাসি সবজি ব্যবহার করা হয় না।
গবেষণাতেও দেখা গেছে হলের খাবারের পুষ্টির ভয়াবহ ঘাটতির কথা। বিসিএসআইআরের পরীক্ষায় দেখা গেছে, একজন ছাত্রের প্রতিদিন অন্তত ২ হাজার ৮২০ কিলোক্যালরি শক্তি প্রয়োজন। কিন্তু জিয়া হলের একজন ছাত্র দুবেলা খেয়ে পায় মাত্র ১ হাজার ৪৪৯ কিলোক্যালরি। অর্থাৎ প্রয়োজনের চেয়ে অর্ধেকেরও কম। প্রোটিনের ঘাটতি থাকে ৩৬ শতাংশ। ছাত্রীদের হলেও একই রকম পুষ্টিহীনতার চিত্র দেখা গেছে।
অনেকে আবার সকালে নাস্তা করেন না। রাত ৯টার পর ক্যানটিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাতে দেরিতে ক্ষুধা লাগলে অস্বাস্থ্যকর টুকটাক খাবার খেয়ে রাত পার করতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমুজাদ্দেদী আলফেছানী টাইমসকে জানান, খাবারের মান বাড়াতে প্রভোস্ট ও পুষ্টিবিদদের নিয়ে কমিটি করা হয়েছে। এ ছাড়া কম দামে খাদ্যসামগ্রী পেতে সরকারি সংস্থা টিসিবির সঙ্গেও কথা চলছে।
তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে এমন আশ্বাস আগেও অনেকবার দেওয়া হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি।


