জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: ৩০ টাকার খাবারে পুষ্টি নেই

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: ৩০ টাকার খাবারে পুষ্টি নেই
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

দেড় কেজি ওজনের একটি ব্রয়লার মুরগি কাটার পর তার ওজন দাঁড়ায় এক কেজির কিছু বেশি। এটি ২০ টুকরো করলে হাড়সহ প্রতিটি টুকরোর ওজন হয় প্রায় ৫০ গ্রাম, যা থেকে মূলত মিলবে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম মাংস। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ডাইনিংয়ে প্রতিদিনের খাবারে প্রাণিজ প্রোটিনের একমাত্র উৎস বলতে এতটুকুই। মাছের টুকরোগুলো আরও ছোট, কারণ বাজারে মুরগির চেয়ে মাছের দাম বেশি।

সরকারি পুষ্টি নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন মানুষের প্রতিদিন মাছ, মাংস ও ডিম মিলিয়ে অন্তত ১৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়া দরকার। অথচ ডাইনিংয়ের দুই বেলা খাবার মিলিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন মাত্র ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম মাছ বা মাংস।

ডালের অবস্থা আরও বাজে। ডাল এতটাই পাতলা যে তা নিয়ে শিক্ষার্থীরা হাসাহাসি করেন। এই ডালে আদৌ কোনো পুষ্টি আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

পুষ্টিবিদরা যেখানে পুষ্টিকর সকালের নাস্তাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলেন, সেখানে হলের ডাইনিংগুলোতে সকালে কোনো খাবারের ব্যবস্থাই নেই। দিনে তিন বেলা খাওয়া যেখানে সাধারণ নিয়ম, সেখানে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে দুই বেলা খেয়ে দিন পার করেন। বেশিরভাগেরই নাস্তার জন্য ভরসা ক্যাম্পাসের ছোটখাটো দোকান।

পুরোপুরি আবাসিক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই হলের ডাইনিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। এখানে প্রতিবেলা খাবারের দাম ৩০ টাকা। মেন্যুতে থাকে ভাত, পাতলা ডাল, সবজি বা ভর্তা, আর সাথে একটি ডিম ভাজি অথবা এক টুকরো মাছ কিংবা মাংস।

স্বাস্থ্যবিদদের মতে, শারীরিক গঠনভেদে একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের দিনে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার কিলোক্যালরি এবং নারীর ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ কিলোক্যালরি শক্তির প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ের খাবারের তালিকা দেখে পুষ্টিবিদ রেবেকা আরজু টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এক বেলার খাবার থেকে সর্বোচ্চ ৪৭০ থেকে ৫৫০ কিলোক্যালরি পাওয়া যায়। দিনে দুই বেলা খাবার আর সকালে হালকা কিছু নাস্তা খেলে শিক্ষার্থীরা মাত্র ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কিলোক্যালরি পান।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রতিদিনের এই ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ ক্যালরির ঘাটতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।

এই খাবারের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ক্যালরিই আসে ভাত থেকে, যা শুধুই শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট; এতে প্রোটিন নেই বললেই চলে।

দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন ও চর্বির অভাব থাকলে মস্তিষ্কের ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো উপাদানের ক্ষরণ কমে যায়। এর ফলে দ্রুত ক্লান্তি, মাংসপেশি শুকিয়ে যাওয়া, মনোযোগের অভাব, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, সিদ্ধান্তহীনতা, বিষণ্নতা ও মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এই অবস্থা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও মেধার বিকাশ আটকে দেয়। খাবারের বাজে মান আর স্বাদের কারণে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে বাইরে গিয়ে খান।

আরও পড়ুন

প্রীতিলতা হলের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার টাইমসকে বলেন, ‘ডাল বেশির ভাগ সময় পানির মতো পাতলা থাকে, কোনো স্বাদ থাকে না। আর খিচুড়ির দিন তা এত নরম হয় যে মুখে তোলা যায় না।’

তিনি আরও জানান, ঠিকমতো রান্না না করার কারণে অনেক সময় মাছের কাঁচা গন্ধ থেকে যায়।

একই হলের আরেক শিক্ষার্থী ইফফাত রাইসা নুহা বলেন, মূলত খাবারের খারাপ মান ও স্বাদের কারণেই ডাইনিংয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে।

মাঝেমধ্যে খাবারের মান একটু ভালো হলে শিক্ষার্থী বাড়লেও তা বেশিদিন টেকে না। কম শিক্ষার্থী খাওয়ার কারণে বাজার ও রান্নার আয়োজন ব্যাহত হয়, যা খাবারের মান আরও কমিয়ে দেয়। ফলে এই বাজে পরিস্থিতির চক্র ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থী হাসান বলেন, ‘ডাল পানির মতো, মাছ-মাংসের টুকরো একদম ছোট। ভাত আর ভর্তা-ভাজি দিয়ে পেট হয়তো ভরে, কিন্তু পুষ্টি পাওয়া যায় না।’

শরীরের ঘাটতি মেটাতে তিনি মাঝে মাঝে ডাইনিংয়ের ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য ক্যানটিন থেকে আলাদা মাছ বা মাংস কিনে নেন।

খাবারে পুষ্টির ঘাটতির কথা মেনে নিয়েছেন হলের প্রভোস্ট মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তবে এজন্য তিনি পর্যাপ্ত বাজেট না থাকাকে দায়ী করেন।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘এক বেলা একজনের খাবারের মোট বাজেট মাত্র ৩০ টাকা। অথচ এক টুকরো মুরগির দামই পড়ে ১২ টাকা। এরপর ভাত, ডাল, সবজি ও রান্নার খরচ হিসাব করলে খাবারের পরিমাণ বা মান বাড়ানো সত্যিই কঠিন।’

সমস্যা সমাধানের বিষয়ে তিনি জানান, ডাইনিংয়ে ৫০ টাকার খাবার চালু করার কথা ভাবা হচ্ছে। এটি সম্ভব হলে বড় টুকরোর মাছ-মাংস, বেশি সবজি অথবা দুটি ডিম দেওয়া সম্ভব হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) সদ্য সাবেক কমিটির স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক হুসনে মোবারক বলেন, বর্তমান বাজারদরে ৩০ টাকায় ভালো খাবার দেওয়া সম্ভব নয়।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে খাবারের মান ও পরিমাণ বাড়ানোর নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি প্রতি বেলা খাবারের দাম ৫০ টাকা করার পক্ষে মত দেন।

তবে তিনি যোগ করেন, ‘দাম বাড়ার পরও যদি খাবারের মান না বাড়ে, তবে শিক্ষার্থীদের কোনো লাভ হবে না।’

এদিকে একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। এক বছর আগে জাকসু নির্বাচনের সময় ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ডাইনিংয়ের খাবারে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু নির্বাচিত কমিটি তা চালু করতে পারেনি।

মোবারক জানান, এ বিষয়ে প্রশাসনকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ১২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ৩০ টাকার খাবারে অর্ধেক ভর্তুকি দিতে বছরে ১৩ কোটি ১৪ লাখ টাকার প্রয়োজন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল সংসদের বিদায়ী ভিপি রকিবুল ইসলাম বলেন, খাবারের দাম সামান্য বাড়িয়ে মান উন্নত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু কিছু শিক্ষার্থী ৩০ টাকার দামকে হলের ‘ঐতিহ্য’ বলে ধরে রাখার দাবি তোলায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad