এসএসসি ফল: শিক্ষার মানে শহর ও গ্রামের বৈষম্য

এসএসসি ফল: শিক্ষার মানে শহর ও গ্রামের বৈষম্য
Advertisement
Advertisement

বিগত প্রায় দুই দশকের মধ্যে দেশে এবার মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে। তবে এই খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের নামকরা স্কুলগুলো বরাবরের মতোই চমৎকার ফলাফল করেছে। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষার মানের এক চরম বৈষম্য।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই বৈপরীত্য দেখিয়ে দিচ্ছে দেশজুড়ে হাজার হাজার স্কুল গড়ে উঠলেও বহু প্রতিষ্ঠানেই মানসম্মত পড়াশোনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

চলতি বছর সারা দেশে গড়ে পাস করেছে মাত্র ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী, যার বিপরীতে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭১ শতাংশ। জাতীয় পর্যায় মোট পাসের হার গড়ে ৬ শতাংশ কমলেও ঢাকা বোর্ডে উল্টো ৪ শতাংশ বেড়েছে। শুধুমাত্র ঢাকা জেলাতেই পাসের হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি।

শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা এই ব্যবধানের পেছনে মূল কারণ হিসেবে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোর শক্ত অবস্থানকে চিহ্নিত করছেন। বেশিরভাগ বিভাগীয় শহরের পাসের হারও আশেপাশের জেলাগুলোর চেয়ে অনেক ভাল।

ভাল স্কুলগুলোর বাইরে বিষয়ভিত্তিক উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবকে শিক্ষার অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেবল সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতেই অন্তত ২৫ শতাংশ শিক্ষকের পদ খালি পড়ে আছে। আর বেসরকারি স্কুল ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সংকট আরও ভয়াবহ।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আকতারুজ্জামান সার্বিক খারাপ ফলাফলের জন্য ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রী এ এন এম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ বোর্ডের অধীনে ইংরেজি ছাড়াও বাংলায় ফেলের হার ছিল অনেক বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে, তারা কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের একটা শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশের কিছু স্কুল সবসময়ই ভাল ফল করে। কারণ, তারা সরকারের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজস্ব কৌশল তৈরি করে সত্যিই মন দিয়ে পড়ায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে এটি পুরো দেশের চিত্র নয়। গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় খোলনলচে বদলে ফেলা না হলে কোটি কোটি শিক্ষার্থী আসল শিক্ষা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।’

ফলাফলের চিত্রে দেখা যায়, হলি ক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পরীক্ষা দেওয়া ২৪৮ জনের সবাই পাস করেছে এবং এর মধ্যে ১৯৮ জনই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যার মধ্যে ৬১ দশমিক ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।

সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন ফেল করেছে, আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১ দশমিক ১৩ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্রাদার প্লাসিড পিটার রিবেইরো এই সাফল্যের পেছনে ‘কঠোর শৃঙ্খলা, পরিকল্পিত পাঠদান এবং শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রমকে’ মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আরও পড়ুন

ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এবার পাসের হার ৯৭ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৯৯ দশমিক ০৬ শতাংশ।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম জানান, পরীক্ষা ও নম্বর দেওয়ার পদ্ধতি পাল্টালেও তাদের স্কুল ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে এবং আরও ভালো করার চেষ্টা করছে।

মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পাসের হার গত বছরের ৯১ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৯২ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে।

দেশের ১২টি ক্যাডেট কলেজও তাদের সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে। একটি ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ টাইমসকে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ঢাকার বাইরেও এই ভাল ফলের প্রভাব ছিল। ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৮৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। আর নরসিংদীর নাসিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের ৩৮২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়ে সাফল্য দেখিয়েছে।

কিশোরগঞ্জের সরজুবালা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৯৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছে মাত্র ৫ জন, আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক চামেলী রানী দাস জানান, নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের মাধ্যমে নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করার কারণেই এই ভালো ফল সম্ভব হয়েছে।

ঢাকায় শিক্ষক সংকট, গ্রামে চরম সংকট

ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২৭৭ জন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী জানান, স্কুলে ৫৫ জন শিক্ষকের জায়গায় খালি আছে ১৭টি পদ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষককে দিয়ে বাংলার ক্লাস করাতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এটি নির্দিষ্ট বিষয়ের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায়।’

তিনি আরও জানান, সারা দেশে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের ১৮ হাজার পদের মধ্যে ৪ হাজার পদই খালি। ফলে বাধ্য হয়েই শিক্ষকদের অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে।

মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাহমিনা ইয়াসমিনও খারাপ ফলের কারণ হিসেবে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, সিলেবাসের পরিবর্তন এবং ঘনঘন পরীক্ষা পদ্ধতি বদলানোকে দায়ী করেছেন।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার হাওলাদার জানান, গ্রাম ও মফস্বল শহরগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও করুণ।

তিনি বলেন, ‘দেশের প্রায় ১৮ হাজার এমপিওভুক্ত স্কুল মাধ্যমিক শিক্ষার বড় দায়িত্ব সামলায়, কিন্তু সেখানে তীব্র শিক্ষক সংকট। বেশিরভাগ স্কুল গ্রামে হওয়ায় মানসম্মত শিক্ষকরা সেখানে থাকতে চান না, ফলে পড়াশোনার মান কমে যাচ্ছে।’

তিনি মনে করেন, ফেল করার আসল কারণগুলো খুঁজে বের করে সমাধান করতে পারলে শিক্ষার মান আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের করুণ দশা

সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে মানবিক বিভাগে, এখানে পাসের চেয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি।

সারা দেশে মানবিক বিভাগের ৫১ দশমিক ২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ রেকর্ড। ২০২৫ সালে এই বিভাগে ফেলের হার ছিল ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ছিল ৩১ দশমিক ৫০ শতাংশ।

ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আকতারুজ্জামান এই ধসের পেছনে গভীর গবেষণার তাগিদ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘পড়াশোনায় ভালো শিক্ষার্থীদের শিক্ষক ও অভিভাবকরা বিজ্ঞান বিভাগে পাঠাতে চান। বাকিদের পাঠানো হয় মানবিকে। কিন্তু তাদের পেছনে পরবর্তীতে আর আলাদা কোনো যত্ন নেওয়া হয় না।’

ঢাকা বোর্ডের সচিব এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা একটি কারণ হতে পারে, তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে আরও ভেবে দেখা দরকার।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, গণিতে দুর্বল হওয়ায় তাকেও মানবিকে পাঠানো হয়েছিল। তবে নিজের চেষ্টা ও পরিবারের সমর্থনে তিনি পরবর্তীতে সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad