একটি এসএমজি, একটি চায়না রাইফেল, দুটি বিদেশি পিস্তল ও একটি শটগান–নগরের চকবাজারের চন্দনপুরায় ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের বাসভবনে হামলা চালাতে সন্ত্রাসীদের হাতে ছিল এসব অস্ত্র। বাসভবন লক্ষ্য করে ছোড়া হয় একাধিক গুলি। তার আগে একই বাড়িতে হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল পিস্তল। অভিযানের পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কিছু অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।
রাউজানে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যায় একাধিক অস্ত্রধারীর উপস্থিতি ধরা পড়ে সিসিটিভি ক্যামেরায়। তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে এলজি দেখা যায়। ধামা ইলিয়াসসহ অন্তত তিনজন গ্রেপ্তার হলেও পায়নি সেই অস্ত্রগুলো।
এরপর বায়েজিদ বোস্তামীর চালিয়াতলীতে পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনায় উদ্ধার হয় এসএমজি, দুটি বিদেশি পিস্তল, পাইপগান, ম্যাগাজিন ও ৪৫৫ রাউন্ড গুলি। একই এলাকায় পরে একাধিক অভিযানে বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
শুধু এই তিনটি হামলা নয়, ২০২৪ সালের পর চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের হাতে ভারী অস্ত্র যেন খেলনার পাত্র। প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি যেন স্বাভাবিক ঘটনা।
সম্প্রতি, যশোর সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। বর্তমানে তিনি ও তার চার সহযোগী রিমান্ডে রয়েছেন। তার গ্রেপ্তারের পর থেকে চট্টগ্রামের মানুষের একটাই প্রশ্ন, চট্টগ্রামে আলোচিত বিভিন্ন হামলায় ব্যবহৃত ভারী এসব অস্ত্র কোথায়?
এই প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ইমনকে রিমান্ডে আনার পর তাদের অস্ত্র নিয়ে তথ্য পেয়েছি। উদ্ধার না হওয়ার আগে প্রকাশ করছি না। আগে আমাদের অস্ত্রগুলো পেতে হবে। কী পরিমাণ অস্ত্র থাকতে পারে সেই হিসাব সে দেয়নি।
তিনি বলেন, বিক্ষিপ্তভাবে না জানিয়ে জানানোর মতো কিছু থাকলে রিমান্ডের পর পুরোপুরি জানানো হবে।
এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ এখনো উদ্ধার হচ্ছে। চট্টগ্রামে সেদিন বিভিন্ন থানা থেকে ৮১৩টি অস্ত্র ও ৪৪ হাজারের বেশি গুলি লুট হয়েছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাসী হামলা, অস্ত্র উদ্ধার এবং প্রশাসনের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, সমস্যাটি শুধু ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার’ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। মূল সংকট হলো- অস্ত্রের উৎস, গতিপথ ও বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো অজানা।
মুজিবুরের বাসায় অস্ত্রের প্রদর্শনী
চন্দনপুরায় মুজিবুর রহমানের বাসভবনে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাটি চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অপরাধের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সিসিটিভি ফুটেজ ও পুলিশি তদন্তে চার মুখোশধারীর হাতে এসএমজি, চায়না রাইফেল, দুটি বিদেশি পিস্তল ও শটগান দেখা যায়। এর আগে ২ জানুয়ারি একই বাসভবনে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবিতে হামলা চালানো হয়। পরে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে একটি এসএমজি, ব্রাজিলের তৈরি টরাস ৯ মিলিমিটার পিস্তল এবং একটি বিদেশি রিভলভার উদ্ধার করে।
কিন্তু এখানেই তদন্তের শেষ নয়। কারণ, একটি অপরাধী দলের কাছে যদি একই সময়ে এসএমজি, চায়না রাইফেল, বিদেশি পিস্তল ও শটগানের মতো বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে- এসব অস্ত্র তাদের কাছে এল কীভাবে?
আর হামলার পর সব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রের ব্যবহার শনাক্ত করা আর অস্ত্র উদ্ধার করা এক বিষয় নয়। কোনো অস্ত্র হামলার সময় ক্যামেরায় দেখা গেলেই সেটি পরে উদ্ধার হয়েছে–এমন ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই ফাঁকটাই এখন চট্টগ্রামের অস্ত্র-তদন্তের বড় দুর্বলতা।
মাসুদ হত্যায় একসঙ্গে একাধিক অস্ত্র
রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যার ঘটনাও একই ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সিসিটিভি ফুটেজে একাধিক অস্ত্রধারীর উপস্থিতি ধরা পড়ে। তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে এলজি দেখা যায়।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তিকে হত্যা করতে শুধু একজন অস্ত্রধারী নয়, একটি সশস্ত্র দল ঘটনাস্থলে গিয়েছিল।
এ ধরনের ঘটনায় তদন্তের স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত–অস্ত্রগুলো কার ছিল?
হামলার পর সেগুলো কোথায় নেওয়া হয়েছে? সব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে কি না? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো এখন কার কাছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু মাসুদ হত্যা মামলার বিচারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভবিষ্যৎ অপরাধ ঠেকানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি অস্ত্র উদ্ধার না হলে সেটি অন্য একটি অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
চালিতাতলী: অস্ত্রের মজুতের আরেক চিত্র
বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির পর যে অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার হয়েছিল, তা চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ভয়াবহতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি এসএমজি, একটি পাইপগান, তিনটি ম্যাগাজিন এবং ৪৫৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
একটি ঘটনাস্থল থেকে এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের অর্থ হলো, সেখানে শুধু একটি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধী অবস্থান করছিল না, বরং একটি সংগঠিত অস্ত্রভাণ্ডারের অস্তিত্বের ইঙ্গিত মিলেছিল।
পরবর্তী সময়েও একই এলাকায় বিদেশি পিস্তল উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এ কারণে চালিতাতলী এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু–এলাকাটি কি শুধু সন্ত্রাসীদের অবস্থানস্থল ছিল, নাকি অস্ত্র সংরক্ষণ ও সরবরাহেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছিল?
সরোয়ার বাবলা হত্যার পরও অস্ত্র
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর চালিতাতলীতে জনসংযোগ কর্মসূচির মধ্যে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহসহ আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় পিস্তল ব্যবহারের তথ্য সামনে আসে।
পরবর্তী সময়ে বাবলার বাসার পাশ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
তবে ওই পিস্তলই বাবলা হত্যায় ব্যবহৃত হয়েছিল–এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রকাশ্য ব্যালিস্টিক তথ্য নেই। কিন্তু ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণে।
একই চালিতাতলী এলাকায় আগে ও পরে একাধিক অভিযানে বিদেশি পিস্তল, এসএমজি ও বিপুল গোলাবারুদ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট হত্যার অস্ত্রের পরিচয় নিশ্চিত করা না গেলেও, ওই এলাকায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি যে ধারাবাহিক, তা একাধিক উদ্ধারের ঘটনায় স্পষ্ট।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ৫ আগস্টের লুট হওয়া অস্ত্র
চট্টগ্রামের অবৈধ অস্ত্রের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সম্ভবত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
সেদিন নগরের বিভিন্ন থানা থেকে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৮১৩টি অস্ত্র এবং ৪৪ হাজারের বেশি গুলি লুট হয়েছিল। পরে উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও সব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
পাহাড়তলী এলাকায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি রিভলভার ও ১৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, অস্ত্রগুলো পুলিশের হলেও কোন থানা থেকে লুট হয়েছিল, তখনো তা শনাক্ত করা যায়নি।
এটি দেখায়, লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে কোথাও পড়ে ছিল বা কারও হেফাজতে ছিল।
আর ২০২৬ সালের জুলাইয়েও ৫ আগস্ট ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া দুটি টরাস পিস্তল উদ্ধারের খবর এসেছে। অর্থাৎ দুই বছর পরও সেই অস্ত্রের সন্ধান মিলছে।
তাহলে প্রশ্ন- যেগুলো উদ্ধার হয়নি, সেগুলো কোথায়? অস্ত্রের হিসাব আর অপরাধের হিসাব কি মিলিয়ে দেখা হচ্ছে? এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখানেই।
একটি অস্ত্র উদ্ধার হওয়ার পর সাধারণত মামলা হয়। কিন্তু একই অস্ত্র আগে কোনো অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, সেটি ব্যালিস্টিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।
এ ধরনের তথ্য এক জায়গায় না থাকলে একটি অস্ত্র একাধিক অপরাধে ব্যবহৃত হলেও তার পুরো গতিপথ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশাসন কী বলছে?
চট্টগ্রামে লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান যে এখনো চলমান, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে।
র্যাব-৭-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান জানান, লুট হওয়া বা অন্যান্য অস্ত্র অপরাধীদের হাতে যাওয়ার বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে এবং এসব অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানও দেখাচ্ছে, পুলিশ অপরাধী চক্রের অস্ত্রের উৎস ও নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করছে। ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রামের একটি অপরাধী দলের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে পুলিশ শনাক্ত করেছে, তার সহযোগী রায়হানের বিরুদ্ধেও অস্ত্র, হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শুধু লুটের অস্ত্র নয়, নতুন অস্ত্রও আসছে। আরেকটি বিষয় আরও বেশি উদ্বেগের। চট্টগ্রামে যে অস্ত্রগুলো উদ্ধার হচ্ছে, তার সবই ৫ আগস্ট লুট হওয়া অস্ত্র নয়।
সাম্প্রতিক অভিযানে নতুন করে বিদেশি পিস্তল, এসএমজি ও গোলাবারুদ উদ্ধার হচ্ছে। অর্থাৎ ৫ আগস্টের লুট হওয়া অস্ত্রের হিসাব একটি অংশ; এর পাশাপাশি নতুন অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহও রয়েছে।
এতে দুটি আলাদা অস্ত্র প্রবাহের সম্ভাবনা সামনে আসে–৫ আগস্ট লুট হওয়া সরকারি অস্ত্রের অব্যাহত হাতবদল ও সীমান্ত বা অন্য উৎস থেকে নতুন অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ও সরবরাহ।
দেশের সীমান্তপথে অবৈধ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের বিষয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগের কথা এসেছে।
অর্থাৎ, চট্টগ্রামের অস্ত্র-সমস্যাকে শুধু ‘৫ আগস্টের লুট’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম নগর সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির বলেন, একজন সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হলে একটি অপরাধী কমে। কিন্তু তার অস্ত্রটি উদ্ধার না হলে সেই অস্ত্রটি অন্য কারও হাতে যেতে পারে। একটি অস্ত্র যদি একটি হত্যায় ব্যবহারের পর উদ্ধার না হয়, সেটি পরবর্তী চাঁদাবাজিতে ব্যবহার হতে পারে। চাঁদাবাজির পর একই অস্ত্র দিয়ে আরেকটি হামলা হতে পারে। এ কারণেই অপরাধী গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


