সৌদিতে কর্মী বাড়লেও প্রত্যাশিত প্রবাসী আয় বাড়েনি

সৌদিতে কর্মী বাড়লেও প্রত্যাশিত প্রবাসী আয় বাড়েনি
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস সৌদি আরব হলেও দেশটিতে বিপুল সংখ্যক কর্মী যাওয়ার সঙ্গে প্রবাসী আয়ের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে দেশটিতে রেকর্ড সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী গেলেও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির হার খুবই সামান্য।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৯ লাখ ৪০ হাজার কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। অথচ এই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে নামমাত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় এসেছিল প্রায় ৫৭২ কোটি ডলার। পাঁচ বছর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসেছে প্রায় ৫৮৫ কোটি ডলার, যা আগের চেয়ে মাত্র ১৩ কোটি ডলার বেশি। এই পাঁচ বছরে গড়ে প্রতিবছর প্রবাসী আয় এসেছে ৪৪৮ কোটি ডলার, যা ২০২১ সালের তুলনায় ১২৪ কোটি ডলার কম।

বর্তমানে সৌদি আরবে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন বলে ধারণা করা হয়। ২০২১ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ২০ লাখের কিছু বেশি। সেই হিসাবে কর্মী সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় বর্তমান প্রবাসী আয় দ্বিগুণ বা তার কাছাকাছি হওয়া স্বাভাবিক ছিল।

প্রতিবছর কর্মী সংখ্যা বাড়লেও ২০২১ সালের পর টানা তিন বছর প্রবাসী আয় কমে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী আয় আগের বছরের চেয়ে ১১৮ কোটি ডলার কমে দাঁড়ায় ৪৫৪ কোটিতে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা আরও কমে হয় ৩৭৭ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বড় ধরনের ধস নেমে প্রবাসী আয় আসে মাত্র ২৭৪ কোটি ডলার। অবশ্য পরবর্তী দুই বছরে এই আয় কিছুটা বাড়ে; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪২৬ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫৮৫ কোটি ডলার দেশে আসে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান টাইমসকে  বলেন, অনেক বেশি মানুষ যাওয়া সত্ত্বেও প্রবাসী আয় না বাড়ার কারণ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অনুসন্ধান করা দরকার।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কর্মী সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার পরও প্রবাসী আয় না বাড়ার পেছনে অবৈধ উপায়ে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বাড়া অন্যতম কারণ হতে পারে। এক্ষেত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৭-১৮ সালের দিকেও প্রবাসী আয় কমে গিয়েছিল। সে সময় এক গবেষণায় সৌদি আরব থেকে টাকা কমার পেছনে অর্থপাচারের যোগসূত্র পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ সৌদি আরব থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হতো এবং দেশে তাদের স্বজনদের কাছে সমপরিমাণ টাকা পৌঁছে দেওয়া হতো।

আরও পড়ুন

সৌদি আরবে কর্মরত শ্রমিক, জনশক্তি রপ্তানিকারক ও দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করে প্রবাসী আয় না বাড়ার আরও কিছু মৌলিক কারণ জানা গেছে। সৌদি আরবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় প্রবাসীদের দৈনিক ও সামাজিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ নিশ্চিত না করেই কর্মী নিয়োগ করে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৮০ শতাংশই অদক্ষ বা আধা-দক্ষ হওয়ায় অন্য দেশের প্রবাসীদের তুলনায় তাদের মজুরি দেওয়া হয় অনেক কম। আবার বিদেশে অবস্থানের অনুমতিপত্র বা কাজের কাগজের মেয়াদ বৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে কর্মীদের উপার্জনের একটি বড় অংশ চলে যায়। পাশাপাশি ইয়েমেনের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের সৌদি আরবে হামলার কারণে একাধিক কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা কাজের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

সৌদি আরব প্রবাসী গাড়িচালক আল আমিন হোসাইন টাইমসকে জানান, জনশক্তি রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় চাকরির নিশ্চয়তা না দিয়েই কর্মী নিয়ে যায়। কাজ না থাকলে অলস বসে থাকতে হয়, কিন্তু খাওয়া-থাকা ও অন্যান্য খরচ বন্ধ হয় না। ফলে দেশে টাকা পাঠানোর বদলে উল্টো দেশ থেকে পরিবারকে টাকা পাঠাতে হয়। কখনো কখনো প্রবাসীদের বেতনও দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়।

আরেক প্রবাসী হাবিবুর রহমান ইনসান বলেন, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দক্ষতার ঘাটতি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রবাসীদের সংকট বাড়াচ্ছে। তার মতে, কারও কারও ক্ষেত্রে কাজের কাগজ তৈরি ও আনুষঙ্গিক খরচে ১৬ থেকে ১৮ হাজার রিয়াল বা প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত লেগে যায়, যা দেশে টাকা পাঠানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিকারক সংগঠন বায়রার সাবেক সেক্রেটারি ফখরুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, সৌদি আরবের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। কারণ দক্ষ কর্মীরা তুলনামূলক ভালো বেতনের কাজ পান।

তিনি আরও বলেন, সরকার বেতন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দরকষাকষি না করায় ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের একই স্তরের কর্মীদের চেয়ে বাংলাদেশি কর্মীরা কম বেতন পান।

তিনি পরামর্শ দেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক পেশায় প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠাতে হবে এবং নিয়োগকর্তার প্রকৃত সক্ষমতা ও কাজের চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দেলোয়ার হোসেন কর্মী অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনি কাঠামোর ওপর জোর দিয়ে বলেন, কর্মী ও নিয়োগকর্তার মধ্যে লিখিত চুক্তি থাকা জরুরি। চুক্তিতে কাজের ধরন, বেতন, দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। সঠিক প্রক্রিয়া না মেনে কর্মী পাঠালে বিদেশে গিয়ে কাজ না পাওয়া বা অনিয়মিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্রত্যাশিত প্রবাসী আয় না আসা প্রবাসীদের পাশাপাশি তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অনেকে জমিজমা ও সম্বল বিক্রি করে বিদেশে যান। স্বপ্ন পূরণ না হলে পরিবারগুলোতে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. মিনহাজুল ইসলাম টাইমসকে জানান, তার বাবা সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় মারা যান। এরপর তার ভাইকে ৭ লাখ টাকা ঋণ করে সেখানে পাঠানো হলেও কয়েক মাস কোনো আয় না থাকায় ঋণ পরিশোধ থমকে ছিল। বর্তমানে তিনি কিছু কিছু টাকা পাঠাচ্ছেন।

মিনহাজুল ইসলাম দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি পর্যায়ে প্রবাসীদের মরদেহ আনা বা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ভোগান্তি রয়েছে, যা দ্রুত সমাধান করা দরকার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad