ঢাকায় জনপ্রিয় হচ্ছে আদিবাসী খাবার

ঢাকায় জনপ্রিয় হচ্ছে আদিবাসী খাবার
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

টেবিলে খাবার আসার আগেই পৌঁছে যায় তার ঘ্রাণ। বাঁশের নল থেকে ভেসে আসে হালকা ধোঁয়ার গন্ধ। সঙ্গে ধীরে রান্না করা মুরগি, বুনো ভেষজ ও তাজা আদার সুবাস।

পাশেই আসে ধোঁয়া ওঠা ভাতের নুডলসের বাটি। স্বচ্ছ ঝোলের ওপর ছড়িয়ে থাকে সবুজ পাতার টুকরো। নেই তেলের ভারী আস্তরণ। নেই অতিরিক্ত মসলা। বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর খাবারের সঙ্গে পরিচিত অনেক স্বাদের উপস্থিতিও এখানে নেই।

আছে পরিমিত স্বাদ ও সতেজতা। বনগ্রাম, পাহাড়ি এলাকা ও নদীতীরের জনপদ থেকে এই রান্নার ধারা পৌঁছে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যস্ততম শহরগুলোর একটি ঢাকায়।

বাংলাদেশে ৫০টির বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, রীতি ও খাদ্যসংস্কৃতি। তবে কয়েক দশক ধরে এই সমৃদ্ধ খাদ্য ঐতিহ্যের বড় অংশ রেস্তোরাঁর মেনুতে দেখা যায়নি।

ঢাকা যখন বিশ্বের নানা দেশের খাবারকে স্বাগত জানিয়েছে, তখন দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব খাবারের স্বাদ ঘর ও দুর্গম জনপদেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

রাজধানীতে অল্প কিছু রেস্তোরাঁ ধীরে ধীরে এসব ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এসব রান্নায় বাঁশ একই সঙ্গে রান্নার পাত্র ও উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের বদলে ব্যবহার করা হয় কলাপাতা। কৃত্রিম স্বাদের পরিবর্তে খাবারে গভীরতা আনে ফারমেন্টেশন বা গাঁজন। মাংসের মতোই গুরুত্ব পায় মৌসুমি সবজি।

প্রতিটি রেস্তোরাঁ বাংলাদেশের প্রাচীন খাদ্যসংস্কৃতির ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরছে।

হেবাং

ঢাকায় আদিবাসী খাবার পরিবেশনের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হেবাং। চাকমা খাবারের সমৃদ্ধ স্বাদের সঙ্গে নগরবাসীর পরিচয় করিয়ে দিয়েছে রেস্তোরাঁটি।

মূলধারার রেস্তোরাঁয় কম দেখা যায় এমন বাঁশের কঞ্চি, বুনো ভেষজ ও ধোঁয়ায় শুকানো মাছের মতো উপকরণ রয়েছে মেনুতে। জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে বাঁশে রান্না করা মুরগি, হেবাং ফিশ ও মারমা সম্প্রদায়ের জনপ্রিয় ভাতের নুডলসের ঝোল ‘মুন্ডি’।

বাঁশের ট্রেতে খাবার পরিবেশন করা হয়। উপস্থাপনায় থাকে গ্রামীণ আবহ। খাবারগুলো ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য ধরে রাখলেও নতুন ভোজনরসিকদের জন্য সহজে গ্রহণযোগ্য। খাবারের দাম সাধারণত ২৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।

আরও পড়ুন

জাবা

আদিবাসী খাবার নিয়ে আলোচনায় চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল বেশি গুরুত্ব পেলেও জাবা তুলে ধরছে ময়মনসিংহ ও মধুপুর অঞ্চলের গারো জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতি।

এখানে ভারী মসলার বদলে খাবার প্রস্তুত করা হয় ভাপে, মোড়কে মুড়িয়ে ও ধীরে রান্নার মাধ্যমে। কলাপাতায় মোড়ানো গোপ্পা, ভাপা মাছ, খারি ও মৌসুমি সবজি মেনুর উল্লেখযোগ্য খাবার। স্বাদে এগুলো হালকা হলেও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

রেস্তোরাঁটির অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় আদিবাসী সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে। খাবারের সঙ্গে পরিবেশও ঐতিহ্যের আবহ তৈরি করে। খাবারের দাম সাধারণত ৩০০ থেকে ৯০০ টাকা।

সিএইচটি কুলিনারি

কোনো একটি জনগোষ্ঠীর খাবারে সীমাবদ্ধ না থেকে সিএইচটি কুলিনারি চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাদ্যঐতিহ্য তুলে ধরে।

মেনুতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবার রয়েছে। এখানে বাঁশে রান্না করা মুরগি, বাঁশের কঞ্চির তরকারি, মুন্ডি, আদিবাসী পদ্ধতিতে রান্না করা ডাল ও স্থানীয় ভেষজ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের ভর্তা পাওয়া যায়।

এক ছাদের নিচে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাবার পরিবেশন করায় রাজধানীতে আদিবাসী খাবারের অন্যতম বিস্তৃত পরিচয় দেয় রেস্তোরাঁটি। খাবারের দাম সাধারণত ২৫০ থেকে ১ হাজার টাকা।

পানকৌড়ি

উত্তরায় অবস্থিত পানকৌড়ি বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবার নিয়ে কাজ করে। মৌসুমি উপকরণের ওপর ভিত্তি করে এর মেনু পরিবর্তিত হয়। তাজা উৎপাদন, বনজ সবজি ও স্থানীয় উপকরণের ওপর ঐতিহ্যবাহী রান্নার নির্ভরতার বিষয়টি এতে প্রতিফলিত হয়।

মেনুতে প্রায়ই থাকে বাঁশের কঞ্চি, ধোঁয়ায় শুকানো মাংস, শাকপাতা ও ঐতিহ্যবাহী চালের তৈরি খাবার।

রেস্তোরাঁটির লক্ষ্য শুধু খাবার পরিবেশন নয়। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ আদিবাসী ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করাও এর উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে ভোজনরসিকদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়, বাংলাদেশের খাদ্যপরিচয় পরিচিত আঞ্চলিক খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

লারং ট্রাইবাল কিচেন

অন্য রেস্তোরাঁগুলোর মতো লারং ট্রাইবাল কিচেন প্রচলিত ডাইন-ইন রেস্তোরাঁ হিসেবে পরিচালিত হয় না। অনলাইন অর্ডার, ক্যাটারিং সেবা ও বিভিন্ন খাদ্য উৎসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচিতি পেয়েছে।

এর মেনুতে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার গুরুত্ব পায়। এর মধ্যে রয়েছে বাঁশে রান্না করা মুরগি, মুন্ডি, ধোঁয়ায় শুকানো মাংস ও বাঁশের কঞ্চির বিভিন্ন পদ। এসব খাবার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা হয়।

আকারে ছোট হলেও নতুন ভোক্তাদের কাছে আদিবাসী খাবার পরিচিত করতে লারং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন ডেলিভারিও খাদ্য ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে, প্রতিষ্ঠানটি তা দেখিয়েছে।

ঢাকায় আদিবাসী খাবারের রেস্তোরাঁ বাড়তে থাকা এসব উপেক্ষিত খাদ্যঐতিহ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। আদিবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের পরিচয় সংরক্ষণ, সংস্কৃতির গল্প তুলে ধরা ও বাংলাদেশি খাবার সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার জায়গা হিসেবেও কাজ করছে।

এসব খাবারের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হয়তো প্লেটের বাইরেও। ঢাকার খাবারের জগতে আদিবাসী খাবারের জায়গা তৈরি হওয়ায় ঐতিহ্যকে স্বাদ নেওয়া, জানা ও মনে রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাঁশে রান্না করা প্রতিটি মুরগি, এক বাটি মুন্ডি কিংবা কলাপাতায় মোড়ানো প্রতিটি খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জনগোষ্ঠী ও একটি এলাকার গল্প।

নতুন কিছুর সন্ধানে থাকা এই শহরে পুরোনো এসব খাবার ভিন্ন স্বাদ এনে দিচ্ছে। এগুলো শুধু নতুন কোনো খাবার চেখে দেখার সুযোগ নয়, বাংলাদেশের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে জানারও সুযোগ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad