‘জস’ সিনেমার ভয়ংকর হাঙর কিংবা ‘শার্কনেডো’ সিনেমার টর্নেডোয় উড়ে যাওয়া হাঙর, চলচ্চিত্রে হাঙরকে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের সমুদ্রে সাঁতার কাটা হাঙর এখন বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিচ্ছে।
ডেলাওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা হাঙরকে সমুদ্রের প্রায় তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে ব্যবহার করছেন। হাঙরের শরীরে বসানো সেন্সর সমুদ্রের তাপমাত্রা, গভীরতা ও লবণাক্ততার তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব তথ্য সমুদ্র, বায়ুমণ্ডল ও জলবায়ু মডেলে ব্যবহার করা হবে।
সিটিডি ট্যাগ নামে ছোট ইলেকট্রনিক যন্ত্র হাঙরের শরীরে বসানো হয়। হাঙর সাঁতার কাটার ও পানিতে ডুব দেওয়ার সময় এটি সমুদ্রের বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা, তাপমাত্রা ও গভীরতা মাপে। বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা লবণাক্ততার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
ডেলাওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড পলিসির অধ্যাপক ও গবেষণার প্রধান অ্যারন কার্লাইল বলেন, ‘প্রাণীর শরীরে বসানো সেন্সর বহু বছর ধরে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে মেরু অঞ্চলে হাতির সিলের ওপর এসব সেন্সর সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।’
কার্লাইল বলেন, ‘হাঙর এ গবেষণায় নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তারা প্রচুর সংখ্যায় রয়েছে, বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে আছে। সংরক্ষিত সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় তাদের কাছে পৌঁছানোও সহজ।’
আগে হাঙরের ট্যাগিং মূলত তাদের চলাচল ও বিচরণক্ষেত্র পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হতো। এখন গবেষকেরা হ্যারিকেনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে উপযুক্ত প্রজাতি বেছে নিচ্ছেন। যেসব হাঙর নিয়মিত পানির ওপরের স্তরে ওঠে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এতে ট্যাগের তথ্য স্যাটেলাইটে পাঠানো যায়।
উত্তর আটলান্টিকে এ গবেষণার জন্য শর্টফিন মাকো, ব্লু শার্ক, স্মুথ হ্যামারহেড ও অপ্রাপ্তবয়স্ক গ্রেট হোয়াইট শার্ককে সম্ভাবনাময় প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কার্লাইল বলেন, ‘আমরা মূলত সমুদ্রের ওপরের স্তরের তাপমাত্রা ও তাপের পরিমাণ নিয়ে আগ্রহী। এই স্তরকে মিশ্র স্তর বলা হয়।’
তিনি বলেন, ‘এই স্তরই হ্যারিকেনের তীব্রতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে। মিশ্র স্তর যত উষ্ণ হবে, হ্যারিকেন তত শক্তিশালী হবে। কারণ এই তাপই হ্যারিকেনকে শক্তি জোগায়।’
ডেলাওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞানের পিএইচডি গবেষক ক্যারোলিন ওয়িয়েরনিকি জানান, মে মাসের শুরুতে হাঙরের শরীরে ট্যাগ বসানোর কাজ শুরু হয়। এ সময় পরিযায়ী হাঙরগুলো শীতকালীন আবাসস্থল থেকে উপকূলের কাছে আসে।
গবেষকেরা গবেষণা জাহাজে করে উপকূল থেকে ৩০ থেকে ৪০ মাইল বা ৫০ থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে যান। সেখানে টোপযুক্ত লাইন ফেলে হাঙরের অপেক্ষা করা হয়। সাধারণত দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে হাঙর টোপে আসে।
কার্লাইল বলেন, ‘ট্যাগগুলো হাঙরের পৃষ্ঠীয় পাখনায় লাগানো হয়। হাঙর পানির ওপরের স্তরে সাঁতার কাটলেই ট্যাগটি কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট রিসিভারে তথ্য পাঠাতে পারে।’
পাঁচ মিনিটেই ট্যাগ বসানোর কাজ
কার্লাইল জানান, হাঙরের শরীরে ট্যাগ বসানোর কাজ গাড়ি রেসের ‘পিট ক্রু’র মতো দ্রুত করা হয়। সাধারণত পাঁচ মিনিটেরও কম সময় লাগে।
হাঙরের ওপর প্রভাব কমাতে প্রাণী সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে ট্যাগ বসানো হয়। সময়ের সঙ্গে ক্ষয় হয়ে খুলে যাওয়ার মতো উপাদান দিয়ে ট্যাগ তৈরি করা হয়েছে।
ছাড়ার আগে প্রতিটি হাঙরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। গবেষকদের মতে, হাঙর চাপের মধ্যে থাকলে বা আহত হলে স্বাভাবিক আচরণ করতে নাও পারে। এতে গবেষণার তথ্যও প্রভাবিত হতে পারে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে হাঙরের অতিরঞ্জিত উপস্থাপনার সঙ্গে বাস্তবতার বড় পার্থক্য রয়েছে বলে জানান ওয়িয়েরনিকি। ১৯৭৫ সালের ‘জস’ সিনেমায় অ্যামিটি দ্বীপে ত্রাস সৃষ্টি করা বিশাল গ্রেট হোয়াইট শার্কের তুলনায় বাস্তব হাঙর অনেক শান্ত।
ওয়িয়েরনিকি বলেন, ‘এটা অনেকটা হিসাব বিভাগের ববের মতো। সে অফিসে এসে দিনের তাপমাত্রার তথ্য সংগ্রহ করে আবার বাইরে চলে যায়।’
গবেষণাটি ‘শার্কনেডো’ সিনেমা সিরিজের মতোও নয়। ওয়িয়েরনিকি মজা করে বলেন, ‘আমরা এখনো হাঙরকে ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ঢোকাচ্ছি বা বের করছি না।’ তবে হাঙর নিয়ে কাজকে তিনি ‘বেশ মজার’ বলে উল্লেখ করেন।
গবেষণা সফল হলে হাঙরের সংগৃহীত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে আঘাত হানার সময় হ্যারিকেনের শক্তি সম্পর্কে আরও নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করবে।
ওয়িয়েরনিকি বলেন, উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে ম্যাসাচুসেটস পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকার মানুষ আরও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস পেতে পারে। এতে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ঝড় মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকার সক্ষমতা বাড়বে।
কার্লাইল বলেন, ‘বন্য পরিবেশে বেশিরভাগ মানুষ কখনো হাঙরের মুখোমুখি হবে না। তবে ভয়ংকর নানা ধারণার মাধ্যমে অনেকেই হাঙরকে চেনে।’
তিনি বলেন, ‘বাস্তবে হাঙর সমুদ্রের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নেওয়া অসাধারণ প্রাণী। তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। হাঙর যদি মানুষকে সহায়তা করতে পারে, তাহলে এটি সবার জন্য লাভজনক।’


