জামদানি: সুতোয় বোনা ঐতিহ্য, সংগ্রামে বাঁধা জীবন

জামদানি: সুতোয় বোনা ঐতিহ্য, সংগ্রামে বাঁধা জীবন
ছবি: ইন্দ্রানী মল্লিক/টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন জামদানি। সূক্ষ্ম নকশা, নিখুঁত বুনন ও অনন্য কারুকাজের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এই শাড়ি মুঘল আমলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিশেষ খ্যাতি লাভ করে।

একটি জামদানি শাড়ির মান নির্ভর করে এর সুতার কাউন্টের ওপর। ৩০ থেকে ৪০ কাউন্টের সুতা অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের, ৬০ থেকে ৮০ কাউন্ট মাঝারি মানের এবং ১০০ থেকে ১২০ বা তার বেশি কাউন্টের সুতা উচ্চমানের হিসেবে বিবেচিত হয়। জামদানির প্রতিটি সুতা কারিগরের ধৈর্য, দক্ষতা ও নিখুঁত শ্রমের সাক্ষ্য বহন করে।

ছবি: ইন্দ্রানী মল্লিক / টাইমস

রাজকীয় ইতিহাসের গৌরব থাকলেও এই শিল্পের কারিগরদের বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। নারায়ণগঞ্জ জেলার তারাবো এলাকার উত্তর মুগরাকুল গ্রামে প্রায় প্রতিটি পরিবারই জীবিকার জন্য জামদানি বয়নের ওপর নির্ভরশীল। এখানে জামদানি কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প নয়, বরং শত শত শ্রমজীবী পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।

প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাঁতিরা তাঁতে বসে কাজ করেন। একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতেই টানা সাত দিন পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করতে হয়। প্রতিটি নকশা যত্নসহকারে তৈরি করা হয় এবং প্রতিটি সুতা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোনা হয়। তাঁতের ছন্দই যেন তাদের জীবনের ছন্দ।

ছবি: ইন্দ্রানী মল্লিক / টাইমস

এই শিল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিবারের শিশুরাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক পরিবারে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই তাঁতের পাশে বড় হয় এবং জীবিকার তাগিদে এই কাজ শিখতে শুরু করে।

আরও পড়ুন

মাত্র আট বা নয় বছর বয়সী ছেলে-মেয়েরাও দীর্ঘ সময় ধরে তাঁতিদের পাশে বসে সুতা গোটানো ও জটিল নকশার সুতা বসানোর কাজ শেখে। ফলে তাদের জীবনে পড়াশোনা, বিদ্যালয় কিংবা খেলাধুলার গুরুত্ব কমে যায়; তাঁতই হয়ে ওঠে তাদের শিক্ষার প্রধান ক্ষেত্র।

অমানুষিক পরিশ্রম করেও বেশিরভাগ তাঁতি ও মজুর ন্যায্য পারিশ্রমিক পান না। উৎপাদিত শাড়ির লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে দিনভর কঠোর পরিশ্রম করেও তাঁতিরা স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবার চালানোর মতো আয় করতে পারেন না।

ছবি: ইন্দ্রানী মল্লিক / টাইমস

তাঁতিদের জন্য এই সংগ্রাম আজীবনের। উত্তর মুগরাকুলের অনেক তাঁতি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁতে কাজ করছেন। বছরের পর বছর ক্ষীণ আলোয় সূক্ষ্ম সুতা গুনতে গুনতে তাদের হাত শক্ত কড়ায় ভরে গেছে, দৃষ্টিশক্তিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবু প্রয়োজনের তাগিদে এবং নিজের শিল্পের প্রতি নীরব গৌরব নিয়ে তারা এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

দীর্ঘ কয়েক দশকের অবিরাম সংগ্রামের পরও এই কারিগরেরা তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী পেশা ছাড়তে রাজি নন। ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি আর কঠিন হয়ে যাওয়া হাত নিয়েও তারা প্রতিদিন তাঁতে বসেন, শুধু পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য নয়, শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্পকে বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যও।

বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত জামদানি শাড়ি যেন সোনার সুতোয় বোনা। অথচ এর নির্মাতাদের ভাগ্যে জোটে কেবল শক্ত কড়া পড়া হাত আর ক্লান্ত চোখ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad