টানা ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ায় তুমুল সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে কোথাও হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা ও ভ্যানে করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এমনকি পরীক্ষা-কেন্দ্রে পানি ওঠায় সিটপ্ল্যান পরিবর্তন করে এবং সময় বাড়িয়ে পরীক্ষা শেষ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সমর্থক ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছে।
পরীক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ
পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে নিয়েও ব্যঙ্গ করতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। রাস্তায় হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে ম্যানহোলের এক বোতল পানি খাওয়ানোর ইচ্ছাও পোষণ করেছেন এক নারী শিক্ষার্থী।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, সেই পরীক্ষার্থী এমন ইচ্ছার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘দেখছেন না কী অবস্থা! ম্যানহোলের নোংরা পানিতে পুরো এলাকা কী রকম নোংরা হয়ে আছে। আর এসবের ভেতর দিয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে হচ্ছে।’
বৃষ্টির মধ্যে স্কুল ড্রেস পড়ে বাসায় বসে ফেসবুকে লাইভ করে শিক্ষামন্ত্রীর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় আরেকজন শিক্ষার্থীকে। কীভাবে তিনি পরীক্ষার হলে যাবে তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন সেই শিক্ষার্থী। অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশে জন্মানোটা জীবনের কাল হয়েছে।’
পরীক্ষার্থীদের কষ্টের সীমা নেই
কুমিল্লায় জলাবদ্ধতার কারণে অনেকগুলো কেন্দ্রে সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি পরীক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি শোচনীয় হওয়ায় কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার সময় আধা ঘণ্টা বাড়িয়ে পরীক্ষা শেষ করা হয়।
তবে পরীক্ষায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করেছেন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের সচিব আব্দুল মালেক।
তিনি বলেন, ‘নৌকা ও ভ্যান দিয়ে শিক্ষার্থীদের পানি পার করে পরীক্ষার হলে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ফোন দিয়ে খোঁজ নিয়েছেন।’
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কাজী আপন তিবরানী জানান, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের নিচতলায় যেসব পরীক্ষার্থীর আসন ছিল, জলাবদ্ধতার কারণে তাদের চারতলায় স্থানান্তর করা হয়েছে, যাতে নির্বিঘ্নে পরীক্ষা নেওয়া যায়। এই কেন্দ্রে আর পরীক্ষা নেওয়া হবে না।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, খাল দখল ও জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা অবৈধ স্থাপনার কারণে জলাবদ্ধতা বেড়েছে। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত করা হবে।
ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবি
ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, দেশের সাতটি জেলায় বন্যায় ইতোমধ্যে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন তাই পরিস্থিতির উন্নতি, পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো পরীক্ষার উপযোগী হওয়া এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখা হোক।
একই ধরনের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন।
এনসিপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ শান্ত এক বিবৃতিতে বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থীর জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে পরীক্ষার সময়সূচি রক্ষা কখনোই বড় হতে পারে না।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও সিলেটসহ যেসব অঞ্চলে এখনো বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি, সেখানে বাস্তবতা বিবেচনায় অবিলম্বে পরীক্ষা স্থগিত করে নতুন সূচি ঘোষণা করতে হবে।
একই দাবিতে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছে ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগর শাখার নেতারা।


