পরিবেশখেকো এক্স সিরামিকস পেল পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ পুরস্কার!

পরিবেশখেকো এক্স সিরামিকস পেল পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ পুরস্কার!
Advertisement
Advertisement

নদী দূষণের দায়ে সরকারের এক মন্ত্রণালয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকেই পরিবেশবান্ধব হিসাবে পুরস্কার দিয়েছে আরেক মন্ত্রণালয়। এতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে পরিবেশ সুরক্ষার সরকারি ব্যবস্থা।

গাজীপুরের শ্রীপুরে মারাত্মকভাবে দূষিত লবলং নদীর পাড়ে স্থাপিত এক্স সিরামিকস নামের প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র স্থগিত করেছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ: তারা অপরিশোধিত কাদামিশ্রিত ধূসর বর্জ্য নদীতে ফেলছে। অথচ এর মাত্র দেড় মাস আগে রাজধানীতে ঘটা করে আয়োজন করা অনুষ্ঠানে এক্স সিরামিকসকে পরিবেশ-বান্ধব সবুজ কারখানা বা ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ পুরস্কার দিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন।

‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর হাতে আসা নথি থেকে পাওয়া গেছে সরকারেরই দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার এমন অবিশ্বাস্য নজির। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, দেশের পরিবেশ রক্ষার চেষ্টাকে প্রহসনে পরিণত করেছে এই ঘটনা।

গত ৬ আগস্টের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠি অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকরা দেখতে পান যে এক্স সিরামিকসের বর্জ্য নির্গমনের ফলে লবলং নদীর তলদেশ অপরিশোধিত কাদামাটির পলি দিয়ে ভরে গেছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটছে। এটি পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন-যার জন্য আইনি শাস্তি প্রযোজ্য।

পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুরের উপ-পরিচালক আরেফিন বাদল এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি ‘টাইমস’কে বলেন, পরিদর্শনের সময় এক্স সিরামিকসের নদী দূষিত করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নথিপত্রে আরো দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সাল থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্রের নবায়ন ছাড়াই চলছে এক্স সিরামিকস। অথচ গত ২৪ জুন এই প্রতিষ্ঠানকেই মর্যাদাপূর্ণ গ্রিন ফ্যাক্টরি পুরস্কার দিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়। কিভাবে এক মন্ত্রণালয়ের তথ্য মাত্র কয়েকটি টেবিল পার হতে ব্যর্থ হলো-এনিয়ে প্রশ্ন তুলেছন সমালোচকরা।

আরও পড়ুন

কীভাবে দূষণের জন্য তদন্তাধীন একটি কারখানা একটি শীর্ষ পরিবেশ পুরস্কার জিততে পারে – এমন প্রশ্নের উত্তরে, ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, এই পুরস্কারটি শিল্পকে “উৎসাহ” প্রদানের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, কারখানাটি যে নদী দূষণ করছে পরিবেশ অধিদপ্তর সেকথা জানায়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কারখানাটিকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক(পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ) সৈয়দ আহমেদ কবির বলেন, “প্রথমে কারখানাটিকে জরিমানা করা হবে। এরপরেও আইন লঙ্ঘন চলতে থাকলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে, অথবা পরিবেশ আদালতে মামলা দায়ের করা হতে পারে।”

শ্রীপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব আহমেদ ‘টাইমস’কে জানিয়েছেন, এক্স সিরামিকস নদীর কিছু জায়গা দখল করেছে। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজের অংশ হিসেবে সেই অংশ থেকে উচ্ছেদের জন্য কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি জানান, লবলংয়ের ওপর নির্মিত কারখানার অংশটি অপসারণ করা হবে। প্রশাসন সেটি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে।

তবে এক্স সিরামিকস তাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি: লবলং একটি খাল, এটি নদী নয়। কারখানাটির ইটিপি’র(ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ফ্লো-মিটার অকার্যকর বলে চিহ্নিত করেছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এনিয়ে জানতে চাইলে কারখানার কর্মকর্তারা উত্তর দেন, “যদি ফ্লো-মিটারটি কাজ না করত, তাহলে আমরা কীভাবে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড’ পেলাম?”

উপগ্রহ চিত্র থেকে দেখা যায়, ২০১৪ সালে কোনো কাঠামো ছিল না। অথচ এখন নদীর দুই পাড়ের কারখানার স্থাপনাসমূহকে সংযুক্ত করতে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। এক্স সিরামিকসের দাবি: নদীর ওপর একটি কালভার্ট নির্মাণের জন্য তাদের এলজিআরডি-এর সমস্ত প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে।

এক সময় ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ লবলং পরিচিত ছিল লবনদহ সাগর নামে, যেটি ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে উৎপন্ন হয়ে মির্জাপুরে তুরাগে গিয়ে মিশেছে। ‘সেন্টার ফর রিভার অ্যান্ড ডেল্টা স্টাডিজ’-এর গবেষণা অনুযায়ী, এর তীরে এক হাজারেরও বেশি শিল্পের কারণে এটি দেশের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলির মধ্যে স্থান পেয়েছে।

সর্বশেষ উপগ্রহ চিত্র থেকে দেখা যায় ধূসর কাদামাটি মেশানো বর্জ্যের কারণে নদীতে মারাত্মক পলি জমাট বাঁধছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয় নদী দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত একটি কারখানাকে পুরস্কৃত করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।

তিনি প্রশ্ন করেন, একই সরকারের এক মন্ত্রণালয়ে দোষী চিহ্নিত একটি কারখানাকে কিভাবে অন্য একটি মন্ত্রণালয় পুরস্কার দেয়? সরকারের এই সিদ্ধান্তকে “ নিন্দনীয়” বলে অভিহিত করেন তিনি।

আলমগীর কবির অভিযোগ করেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে শ্রম মন্ত্রণালয় পক্ষপাতিত্বের বশবর্তী হয়ে কারখানাটিকে পুরস্কার দিয়েছে। অবিলম্বে এই পুরস্কার বাতিল করে এর সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানায় বাপা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad