ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সংঘাতের রেশ কেবল রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা বৈশ্বিক রাজনীতি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সংঘাত বৈশ্বিক নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের পরিবর্তনশীল ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘নিরাপত্তা প্রদানকারী’র ভূমিকায় নেই, বরং দেশটি ক্রমশ অস্থিরতার উৎসে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘদিনের কিছু প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে ইসরায়েলের অভেদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তেহরানের প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোটের কাঠামো এখন প্রশ্নের মুখে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘নিরাপত্তা প্রদানকারী’ থেকে ‘নিরাপত্তা লঙ্ঘনকারী’?
একটি রাষ্ট্র যখন কেবল নিজের নয়, বরং সামরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে অন্য দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তখন তাকে প্রকৃত নিরাপত্তা প্রদানকারী বলা হয়। গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে এই ভূমিকায় ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংঘাত এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
সমালোচকরা বলছেন, ওয়াশিংটন এখন শান্তি রক্ষার বদলে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে বেশি ভূমিকা রাখছে। অভিযানের শুরুতে সীমিত সামরিক লক্ষ্যের কথা বলা হলেও বর্তমানে তা তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দিকে মোড় নিয়েছে। যদিও কয়েক সপ্তাহের টানা অভিযানের পরও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এর ফলে বৈশ্বিক অস্ত্রের বাজারে বড় পরিবর্তন আসতে পারে এবং মিত্র দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্র কেনায় উদ্বুদ্ধ করার একটি প্রচ্ছন্ন চাপ তৈরি হতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ
এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার চিরাচরিত সংজ্ঞাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। ইরানের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ সত্ত্বেও দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে, ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিরঙ্কুশ নয়।
দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার এবং ইরানকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত তেহরানের টিকে থাকার এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা প্রকাশ করেছে, যা ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের ধরনে প্রভাব ফেলবে। এই সংকটের মধ্যেও ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি যে কূটনৈতিক সংযম প্রদর্শন করেছে, তা তেহরানের জন্য একটি কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৯টি সামরিক ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও সেখানে মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। এই শূন্যস্থানে চীন একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যার ইঙ্গিত ইতিপূর্বে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনস্থাপনে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় পাওয়া গেছে।
বৈশ্বিক অস্ত্র সংগ্রহে প্রভাব
সংঘাতের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অস্ত্র কেনার ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের দেশগুলো মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। যদিও তারা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রকে ত্যাগ করবে না, তবে একক নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনার প্রবণতা বাড়বে। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অস্ত্র সংগ্রহে এখন ইউরোপীয় দেশ, চীন বা রাশিয়ার দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে পারে।
বিদ্যমান নিরাপত্তা জোটগুলোর ওপর চাপ
বর্তমান যুদ্ধ প্রচলিত জোটগুলোর ভেতরের ফাটলকেও স্পষ্ট করে দিয়েছে। ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য গঠিত ন্যাটো জোটের সদস্যদের মধ্যে বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটন যখন তার মধ্যপ্রাচ্য কৌশলে ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থন চাইছে, তখন তাদের নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিন্নতা সামনে চলে আসছে।
একইভাবে এশিয়ায় চীনকে মোকাবিলায় গঠিত ‘অকাস’ (যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া) জোটের কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, কারণ তাদের কৌশলগত মনোযোগের বাইরে কোনো সংঘাত তৈরি হলে সদস্যরা একমত হতে পারছে না। এই পরিস্থিতি দেশগুলোকে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় বিকল্প বা নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করতে পারে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ
বিশ্ব রাজনীতির এই টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশকে এক জটিল আন্তর্জাতিক পরিবেশ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকাকে অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ব্লকের দিকে ঝুঁকে না পড়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব হাসান সালেহ মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত শান্তি-কেন্দ্রিক কূটনৈতিক কৌশলে অবিচল থাকা। তার মতে, বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে শান্তি-কেন্দ্রিক, যেখানে আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের মতে, বিশ্ব এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা স্থিতিশীল হতে সময় লাগতে পারে। তাই বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থ ও বিশ্বশান্তিকে গুরুত্ব দিয়ে অত্যন্ত সাবধানে পথ চলতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আগামী বহু বছর বিশ্ব কূটনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।


